নওগাঁর রাণীনগর উপজেলায় কৃষকদের জন্য দেওয়া এডব্লিউডি প্রদর্শনী ভেস্তে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করতে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এদিকে কৃষকরা তাদের প্রদর্শনীর নায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হলেও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে দেখা দিয়ে প্রশ্ন। তারা যেন মুখে কলুপ এঁটেছেন।
ফলে কৃষি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ভেস্তে গেছে কৃষকদের জন্য নেওয়া সরকারি উদ্যোগ।
জানা গেছে, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে অজ্ঞ কৃষকদের সহায়তা না করায় পার্টনার ফিল্ড স্কুল প্রকল্পের আওতায় গ্রহণ করা পর্যায়ক্রমে জমি ভেজানো ও শুকানো (এডব্লিউডি) প্রযুক্তি নির্ভরশীল প্রদর্শনীর কার্যক্রম ভেস্তে যাওয়ায় আলোর মুখ দেখেনি। এনিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে কৃষি বিভাগের উচ্চ পর্যায় নড়েচড়ে বসেছে এবং তদন্তের উদ্দ্যেগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা না করার ঠুকনো অভিযোগ থাকলেও এবার প্রদর্শনীর সুবিধাভোগী কৃষকরা এসে ভিন্ন কথা বলেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট। এতেই বেধেছে বিপত্তি। এ যেন কেঁচো খুড়তে সাপ বেড়িয়েছে।
আরও জানা যায়, একজন কৃষককে তার দুই একর জমিতে প্রদর্শনীর জন্য বিভিন্ন উপকরণসহ ৫০হাজার টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়। এভাবে চার জন কৃষককে তাদের ৮একর জমি উপর স্থাপিত ৪টি প্রদর্শনীর জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ নয়ছয় করে কম উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এরমধ্যে তিনজন কৃষক পরিমাণে কম উপকরণ পেয়েছে বলে সরাসরি অভিযোগ করেন।
এমবকি গত মঙ্গলবার (২৫ আগষ্ট) প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ৪ জন কৃষককে উপজেলা কৃষি অফিসে ডেকে এনে জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
তাই দায়িত্বহীনতা ও অবহেলা জনিত কারণে প্রদর্শনীর সুফল ভেস্তে গেলেও কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত সমস্ত উপকরণ দেওয়া হয়নি বলেই খোদ কৃষকদের কথা থেকেই এমন গুরুত্বর অভিযোগ উঠে এসেছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মোঃ মেহেদুল হাসান ও খোদ দপ্তর প্রধান উপ-পরিচালক মোঃ মনজুর রহমান পরস্পর বিরোধী বক্তব্যে দেয়ার কারণে আরও রহস্যের দানা বেঁধেছে।
অভিযোগ উঠেছে তারা দায়ীদের বাঁচাতেই মুখে কুলুপ এঁটে কিছু একটা আড়াল করার চেষ্টা করছেন।
এ বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মোঃ মেহেদুল হাসান বলেন, অফিসের ও মাঠের সার্বিক অবস্থা নিয়ে কথা বলার জন্য গিয়েছিলেন। এডব্লিউডি নিয়ে কৃষকদের সাথে কথা বলেছি। কৃষকরা কি বলেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা তদন্তের বিষয় আপনাকে বলবো না। আহবায়ক অন্য আরেক জন আছে, এটা নিয়ে ডিডির সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
আর তদন্তের বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইলেন নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অদিপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ মনজুর রহমান। তিনি কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাকিমা খাতুনের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, আমরা তো ফ্রি কুইন্টলি সব অফিসেই যাই। এডব্লিউডির তদন্ত সর্ম্পকে তিনি বলেন, একটি স্রোত যখন মুভ করে, তখন হুট করে থামাতে পারবেন না। আস্তে আস্তে একটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। আমাদের কাছে একটা ইয়ে আছিলো….. বলে স্পষ্ট করেননি। তিনি আরও বলেন, আমরা সব গুলো বিষয়েকে এ্যাডড্রেস করেছি। অন্ধকার থেকে আমরা সবাই আস্তে আস্তে আলো বের করি।
অভিযোগ উঠেছে, নওগাঁর রাণীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার কারণে বোরো মৌসুমে ২৮ থেকে ৩০শতাংশ পানি সাশ্রয়ের জন্য গ্রহন করা পার্টনার প্রকল্পের আওতায় গ্রহন করা পর্যায়ক্রমে জমি ভেজানো ও শুকানো (এডব্লিউডি) প্রযুক্তি নির্ভর প্রদর্শনীর কার্যক্রম ভেস্তে যায়। যার ফলে তেমন কোনো সুফল আসেনা।
এ নিয়ে গণমাধ্যমে ফলাও করে সংবাদ প্রকাশের পর গত মঙ্গলবার (২৫আগস্ট) থেকে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হলেও কিছু একটা গোপন করতে গিয়ে শুরুতেই লুকোচুরি খেলার অভিযোগ উঠেছে। ফলে তদন্ত কার্যক্রমের ফলাফল আদৌ আলোর মুখ দেখবে কিনা তা নিয়ে শুরুতেই সংশয় দেখা দিয়েছে।
সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রতি দুই একর (একক) প্রদর্শনীর জন্য বিভিন্ন উপকরণসহ ৫০হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। কৃষকের ৮টি উপকরণ হিসেবে ২০কেজি বীজ, বীজ শোধকের নগদ টাকা, ২০০ (৪বস্তা) কেজি ইউরিয়া সার, এভাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডিএপি ও এমওপি সার, জিংক সালফেট (মনো), জিপসাম, বোরণ, জৈব সার, বালাইনাশক ও আগাছা নাশক, এব্লিউডি পাইপ, শ্রমিক বাবদ নগদ টাকা, ১’শ কেজি ধারন ক্ষমতা সম্পন্ন ড্রাম, ১টি সাইন বোর্ড বাবদ টাকা। এছাড়া পরিবহন খরচ (থোক), ফিল্ড টেকনোলজি ওরিয়েন্টেশন ভাতা, অন্যান্য খরচ বাবদ ১হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, কৃষকের বরাদ্দ থেকে কাটছাট করে উপকরণ দেওয়া হয়। কৃষকদের অভিযোগ তাদের প্রদর্শনীর জন্য সরকার আসলে কি কি বরাদ্দ দিয়েছিলো তা তাদের জানা ছিলো না। তাই তারা অন্ধকারে ছিলো। তাদের যা দিয়েছে সেটা দিয়েই প্রদর্শনী করার চেষ্টা করেছে। কৃষকদের নতুন এই প্রযুক্তি ব্যবহারের হাতে কলমে কোনো নিয়মকানুন বা প্রশিক্ষণ না দেওয়ার ফলে সফলতার মুখ দেখেনি। ফলে কৃষকরা ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
উপজেলার কালীগ্রাম কসবাপাড়া গ্রামের বাবু সরদার, চকবলরাম গ্রামের কৃষক ওসমান আলী ও জলকৈ গ্রামের কামরুল ইসলাম বলেন, প্রদর্শনীর জন্য কি কি উপকরণ তা আমাদের বলা হয়নি ইউরিয়া সার ৩বস্তা, ডিএপি ২বস্তা, এমওপি ১০০কেজি দিয়েছে, ড্রামের দাম ৬’শ বা ৭’শ টাকা হবে, বোরন ছোট ২/৩ প্যাকেট, জিপসাম ৪০কেজি, জৈব সার ৮০কেজি, শ্রমিক বাবদ টাকা দেওয়া হয়নি, জিংক সালফেট (মনো) ৫কেজি, বালাইনাশক ও আগাছা নাশক বাবদ ৩’শ টাকার মতো ঔষধ দিয়েছে, সাইন বোর্ডের বাঁশ নিজের টাকা দিয়ে কিনে বসাতে হয়েছে।
কৃষক ওসমান আলী ক্ষোভের সহিত বলেন, শ্রমিকের টাকা তো দূরের কথা, বরং নিজের টাকায় বাঁশ কিনে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। সার ছাড়া তেমন কিছু দেয়নি।
কৃষক কামরুল ইসলাম বলেন, বীজ পেয়েছি, কিন্তু বীজ শোধকের টাকা পাইনি। আর এতো কিছুতো আগে জানিনা, জানলে তো বলতাম। কাজেই তারা যা দিয়েছে সেটাই নিতে হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের নামে আসা বরাদ্দ যদি কেউ সঠিকভাবে না দেয়, তাহলে এটাতো আমরা জানবো না। তবে যা দিছে এটা নিয়ে আর কিছু বলতে চাইনা। কারণ বিনা পয়সায় আমাদের হয়রানি হতে হয়। অফিসে গিয়ে বলতে হয়।
তারা সকলেই বলেন, শুধু বীজ ছাড়া সকল সার কম দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ বলেন এই প্রোজেক্ট থেকে মারিং কাটিং এর মাধ্যমে আত্মসাৎ করে খেয়েছে। এটার তদন্ত হচ্ছে। বড় অফিসার এসেছিলেন। আমাদের কাছ থেকে সত্য কথা শুনে গেছে।
কাগজ কলমে ঠিক থাকলেও অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কৃষকের নায্য বরাদ্দ এভাবেই নয়ছয় করার অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষেয়ে উপজেলা কৃষি অফিসার মোছাঃ মোস্তাকিমা খাতুনকে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেনি।
তবে অতিরিক্ত কৃষি অফিসার জাহিদুল ইসলাম তদন্ত শুরু হওয়ার করা স্বীকার করে বলেন, যেসব এলিগেন্স ছিল সেসব বিষয়ে জেলার স্যারেরা কৃষকসহ আমাদের সকলের বক্তব্য শুনেছেন। আর সঠিকভাবে উপকরণ দিয়েছেন কিনা এমন বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি হোয়াটসঅ্যাপ এ কল দিতে বলেন ।
রাণীনগর উপজেলায় পার্টনার ফিল্ড স্কুল প্রকল্প সফল করার জন্য ডবল কেবিন পিকআপ, জ্বালানী সুবিধা এবং উপজেলা কৃষি অফিসার ও অতিরিক্ত কৃষি অফিসার সার্বক্ষনিক থাকার পরেও কেন সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প আলোর মুখ দেখলো না তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে এবং খতিয়ে দেখে দায়ীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ সময়ের দাবী বলে সচেতন মহল মনে করছে।