বিদেশে উন্নত জীবনের স্বপ্ন—যে স্বপ্ন অনেক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে ছিল অন্ধকার ভেদ করে আলোয় পৌঁছানোর একমাত্র সিঁড়ি, সেই স্বপ্নই আজ পরিণত হয়েছে দীর্ঘশ্বাস, কান্না আর নিঃস্বতার আর্তনাদে।
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর নামে সংঘবদ্ধ প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্মসাৎ, ভুয়া টিকিট প্রদান, নেপাল ও মালয়েশিয়ায় নিয়ে সর্বস্ব লুট এবং একাধিক পরিবারকে পথে বসিয়ে দেওয়ার অভিযোগে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযুক্তরা হলেন, ফরিদপুর জেলার নগরকান্দার এলাকার মেহেদী হাসান, গোপালগঞ্জ মকসুদপুর উপজেলার গারলগাতি গ্রামের নরু হাদি মোল্লার ছেলে জনি মোল্লা,
ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার বীল গবেন্দপুর গ্রামে সালাম তালুকদার এর ছেলে লিখন তালুকদার,নরসিংদী জেলা সদরে ব্রাহ্মণপাড়ার আজগর আলীর ছেলে নাইবুর রহমান ও তার ভাগিনী জামাই
বশির আহমেদ নয়ন।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) দুপুরে ভৈরবে দুর্জয় মোড়স্থ শামীম অ্যাড ফার্ম অ্যান্ড মিডিয়া হাউজে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো চোখের জল আর বুকভরা ক্ষোভ নিয়ে তাদের দুর্ভোগের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, ভৈরব নিউ টাউনে অবস্থিত “আল ওয়াসী ভিসা ইন লিঃ” এবং “এমপিআর গার্ড সিকোরিটি সার্ভিস লিঃ” নাম ব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।
ভুক্তভোগীরা হলেন, হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সুলতান মাহমুদপুর এলাকার, শ্রাবণ, কামাল,নাঈম,সহ আরো অনেকে।
ভুক্তভোগী তোসি আহমেদ বলেন, অভিযুক্ত মেহেদী হাসান, জনি মোল্লা, লিখন তালুকদার, নাইবুর রহমান ও সাবেক জিএম বশির আহমেদ নয়ন-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই চক্রের মাধ্যমে অন্তত ১২ জনের কাছ থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে।
কেউ বিদেশে যাওয়ার আশায় জমি বিক্রি করেছেন, কেউ স্ত্রীর গয়না বন্ধক রেখেছেন, আবার কেউ সুদে ঋণ নিয়ে টাকা জোগাড় করে টাকা দেয় দালাল চক্রকে। আজ সেই পরিবারগুলো যেন ঝড়ে ভেঙে পড়া নীড়ের মতো অসহায়, নিঃস্ব ও দিশেহারা।
জানাযায় গত (৮ জুন ২০২৫) তারিখে পাভেল, নিপেল, নুরুন নবী, হাবিবুর রহমান, কামাল ও শ্রাবণসহ ৬ জনকে আলবেনিয়া পাঠানোর কথা বলে প্রথমে নেপালে নেওয়া হয়।
পরে তাদের (১৩ জুন ২০২৫) ফ্লাইট দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পাঠানো হয়নি। নেপালে অবস্থানকালে তাদের খাবারের সঙ্গে অচেতন করার ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হয়। অচেতন অবস্থায় তাদের সঙ্গে থাকা ৬ হাজার ইউরো, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ লাখ ৫৮ হাজার টাকা, ছিনিয়ে নেয় দালাল চক্রের সদস্যরা।
এছাড়াও সাইদুর রহমানকে স্পেন পাঠানোর নামে ভুয়া টিকিট দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়,
শফিকুজ্জামান হিরাজকে ফ্রান্স পাঠানোর কথা বলে মালয়েশিয়া থেকে ফেরত আনা হয়। এবং দিপু ও নাঈমের কাছ থেকে সার্ভিয়ায় পাঠানোর নামে ৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী মোঃ আবু সাঈদ বলেন, আমার ভাবী তোসি আহমেদের মাধ্যমে আমার ভাই, বিয়াই ও নিকট আত্মীয়সহ প্রায় ১২ জনের কাছ থেকে দেড় কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে। এখন কোম্পানির মালিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অফিস গুটিয়ে লাপাত্তা। আমরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও কাউকে পাচ্ছি না।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাড়িঘর ছেড়ে ৩টি শিশু সন্তান রেখে প্রতারক চক্রের সন্ধানে ঘুরছি। আমরা দিশেহারা হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন, মোহাম্মদ আলমগীর, শ্রাবণ আহমেদ, কামাল মিয়া ও আবু সাঈদ। তারা দ্রুত প্রতারক চক্রকে গ্রেপ্তার, আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধার, ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত এবং জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্নকে পুঁজি করে প্রতারণার এমন ভয়াবহ ঘটনা রোধে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। কারণ মানুষের স্বপ্ন যখন পাসপোর্টের পাতায় বন্দী হয়, তখন প্রতারণার আঘাত শুধু অর্থ নয়—ভেঙে দেয় একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, বিশ্বাস ও বেঁচে থাকার সাহসও।