কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে দুর্বৃত্তদের অতর্কিত হামলায় নির্মমভাবে নিহত অটোরিকশা চালকের পুত্র জুয়েল মিয়ার হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার ও সর্বোচ্চ বিচার ফাঁসির দাবিতে লাশের খাটিয়া কাঁধে নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
শনিবার (১১জুলাই) সন্ধ্যার পর জুয়েল মিয়ার নামাজে জানাজা শেষে লাশ দাফনের আগে খাটিয়া কাঁধে নিয়ে এই নজিরবিহীন বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। বিক্ষোভকারীরা হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে স্লোগানে স্লোগানে এলাকা উত্তাল করে তোলেন। শত শত মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মিছিলটি লক্ষ্মীপুর দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে শুরু হয়ে নিহতের নিজ বাড়ি লক্ষ্মীপুর বুধাইবাড়ি গিয়ে শেষ হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে অশ্রুসিক্ত নয়নে জুয়েলের মরদেহ সমাহিত করা হয়।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ জুলাই শুক্রবার বিকেলে জুয়েল মিয়া (২০) তার এক বন্ধুর ডিমের গাড়িতে চড়ে আগরপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে লক্ষ্মীপুর বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। গাড়িটি গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের বড়চারা বাজারের ১০০ গজ পশ্চিমে পৌঁছালে ওত পেতে থাকা একদল দুর্বৃত্ত গাড়ির গতি রোধ করে। তারা জুয়েলকে জোরপূর্বক গাড়ি থেকে নামিয়ে প্রকাশ্যে রাস্তায় এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। হামলায় জুয়েল গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। পরে পথচারীরা তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে ভাগলপুর জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এলাকাবাসীর দাবি, লক্ষ্মীপুর ও বড়চারা এলাকার কয়েকজন যুবকের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। তবে নিহত জুয়েল সম্পূর্ণ নিরপরাধ ছিলেন এবং ওই বিরোধের সাথে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। কোনো অপরাধ বা বিরোধে জড়িত না থেকেও কেবল পরিস্থিতির শিকার হয়ে অকালে প্রাণ হারাতে হলো এই সম্ভাবনাময় যুবককে। নিহত জুয়েল গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর বুধাইবাড়ি গ্রামের অটোরিকশা চালক মো. কুদ্দুস মিয়ার ছেলে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “একটি তরতাজা প্রাণ এভাবে প্রকাশ্য রাস্তায় ঝরে যেতে পারে না। আমরা কোনো ধরনের বিচারহীনতা চাই না। প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীরা দ্রুত পার পেয়ে গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।”
জুয়েলের এই আকস্মিক ও নির্মম মৃত্যুতে গোটা লক্ষ্মীপুর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারি আর প্রতিবেশীদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ। এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে লক্ষ্মীপুর বাজার ও বুধাইবাড়ি গ্রামে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে, পরিস্থিতি বর্তমানে থমথমে।
এদিকে ঘটনার পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে বলে জানা গেছে। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে প্রয়োজনীয় অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দীন বলেন, “হত্যার কারণ উদঘাটন এবং দোষীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ মাঠে কাজ করছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (শনিবার রাত পর্যন্ত) নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ না পাওয়ায় মামলা রুজু করা সম্ভব হয়নি, তবে মামলার প্রস্তুতি চলছে।”
একটি নিরীহ যুবকের এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, দ্রুত অপরাধীদের গ্রেফতার এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিতের মাধ্যমে আর কোনো পরিবার যেন এমন পরিণতির শিকার না হয়- এটাই এখন কুলিয়ারচরের সর্বস্তরের মানুষের একমাত্র প্রত্যাশা।