কর্মব্যস্ত গ্যারেজে এখন সুনসান নীরবতা• সংসার চালাতে হিমশিম মেকানিকরা• ক্রেতার অপেক্ষায় বসে থাকেন পার্টস ব্যবসায়ীরা
সারা দেশে চলমান জ্বালানি তেল সংকটের প্রভাব পড়েছে টাঙ্গাইল মির্জাপুরে মোটরসাইকেল গ্যারেজ ও যন্ত্রাংশ ব্যবসা এবং মেকানিকদের জীবনে।
যেখানে একসময় সারাদিন ব্যস্ততা লেগেই থাকত, সেখানে এখন নেমে এসেছে সুনসান নীরবতা। কাজ কমে যাওয়ায় আয়হীন দিন কাটাচ্ছেন শত মিস্ত্রি ও সংশ্লিষ্ট শ্রমজীবী মানুষ।
মির্জাপুরে বাইমাটিয়া,বাইপাস,দেওহাটা,গোড়াই,
বাঁশতৈল,পাকুল্ল্যা মোটরসাইকেল মেরামত ও পার্টস ব্যবসার জন্য পরিচিত একটি ব্যস্ত এলাকা। সেখানকার চিত্র এখন একেবারেই ভিন্ন। সাধারণ সময়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিকল বাইক নিয়ে ছুটে আসতেন চালকরা, আর সেগুলো মেরামতে ব্যস্ত সময় পার করতেন মিস্ত্রিরা। কিন্তু গত এক মাসে সেই চেনা দৃশ্য পাল্টে গেছে।
জ্বালানি তেলের অভাবে বাইক চলাচল কমে যাওয়ায় গ্যারেজগুলো এখন প্রায় ফাঁকা। হাতুড়ি-রেঞ্চের শব্দের বদলে ভর করেছে নীরবতা। কাজ না থাকায় অলস সময় কাটাতে হচ্ছে কর্মীদের। অনেকেই বলছেন, পেট্রোল-অকটেনের সংকটে প্রয়োজন ছাড়া বাইক বের করছেন না চালকরা, ফলে কাজের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
উপজেলা পরিষদের চত্বরের মোটরসাইকেল মিস্ত্রি পরিমন সরকার বলেন, আগে প্রতিদিন গ্যারেজে অনেক কাজ থাকত। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বসে থাকার সুযোগই পেতাম না। কিন্তু এখন জ্বালানি তেল সংকটের কারণে মানুষ বাইক কম চালাচ্ছে, ফলে কাজও অনেক কমে গেছে। দিন শেষে আয় না থাকায় সংসার চালানো ও দোকানে কর্মচারীদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছি এখন খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।
একই অবস্থা জানিয়ে ভাগখন্ড বাজারের মেকানিক সাইদুর রহমান বলেন, আগে দিনে ৭-১০টা বাইকের কাজ করতাম, এখন সেখানে ২-৩টাও আসে না। বেশিরভাগ সময় বসেই থাকতে হচ্ছে। এই অবস্থায় পরিবারের খরচ চালানো নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি।
শুধু গ্যারেজই নয়, একই অবস্থা মোটরবাইক পার্টস ব্যবসায়ীদেরও। ক্রেতা না থাকায় দোকানগুলোতে নেই আগের মতো ভিড়। অনেকেই সময় কাটাচ্ছেন মোবাইলে, কেউ আবার বসে আছেন ক্রেতার অপেক্ষায়। তবে দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতনসহ নানা খরচ ঠিকই বহন করতে হচ্ছে তাদের, যা বাড়তি চাপ তৈরি করছে। তারাও দিশাহারা এই সংকটে।গোড়াইয়ে পার্টস ব্যবসায়ী জাহিদুল ইসলাম বলেন, আগে প্রতিদিন দোকানে অনেক ভালো বিক্রি হতো, ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকত। কিন্তু এখন জ্বালানি তেল সংকটের কারণে বাইক কম চলাচল করায় মালামাল বিক্রি অনেক কমে গেছে। সারাদিন বসে থেকেও তেমন বেচাকেনা হয় না। দোকান ভাড়া ও অন্যান্য খরচ চালাতে কষ্ট হচ্ছে।
পাকুল্ল্যা পার্টস ব্যবসায়ী আরিফ ইসলাম বলেন, এখন দোকানে আগের মতো আর ক্রেতা আসে না। সারাদিন বসে থাকি। মালামাল বিক্রি হচ্ছে খুবই কম। অথচ দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতন সব খরচ ঠিক আগের মতোই দিতে হচ্ছে। জ্বালানি তেল সংকট না কাটলে আমাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।
‘আগে প্রতিদিন দোকানে অনেক ভালো বিক্রি হতো, ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকত। কিন্তু এখন জ্বালানি তেল সংকটের কারণে বাইক কম চলাচল করায় মালামাল বিক্রি অনেক কমে গেছে।’
মির্জাপুর উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে রয়েছে সহস্রাধিক গ্যারেজ ও প্রায় এক শতাধিক মোটরসাইকেল যন্ত্রাংশের দোকান। এই খাতের সঙ্গে কর্মসংস্থানে জড়িত বিপুল সংখ্যক মানুষ এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
মির্জাপুরের ছিটমামুদপুর গ্রামের মোটরসাইকেল চালক মাসুদ বলেন সারা দিন দাড়িয়ে থেকে তেল নিতে হয়।বাহির থেকে ২২০ লিটার তেল কিনতে হয়। যাত্রীদের কাছে একটু ভাড়া বেশি ছেলে চাইলে যাত্রীরা আমাদের সাথে ঝগড়া করে। এমন অবস্থায় আমরা খুব কষ্টের দিন কাটাচ্ছি। দ্রুত সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। তা না হলে এই পেশায় বর্তমানে টিকে থাকাও কঠিন হয় যাবে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, জ্বালানি তেল সংকট দ্রুত সমাধান না হলে এই খাতের লোকজন বিপাকে পড়বে। এতে বেকারত্ব আরও বাড়বে এবং জীবিকার সংকট আরও গভীর হবে।