গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া ইউনিয়নের উত্তর করফা গ্রামে একটি মৎস্য খামারে বিষ প্রয়োগ, মাছ চুরি এবং বাঁশের পাটা পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে আদালতে দায়ের করা একটি মামলা ঘিরে স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করা ওই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে মোট ১৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে।
আজ ( ১৭জুলাই)২০২৬ শুক্রবার সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে মিলেছে মিথ্যা মামলা রহস্য।
উত্তর করফা গ্রামের মোঃ ফোরকান শেখ (২৮) বাদী হয়ে প্রতিবেশী নিজাম শেখ (৫২), তাঁর দুই পুত্র খায়রুল শেখ (২৭) ও জহুরুল শেখ (২২) সহ অজ্ঞাতনামা ৫/৭ জনের বিরুদ্ধে এ মামলা দায়ের করেন। তবে সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, স্থানীয় বাসিন্দা ও খোদ মামলার সাক্ষীদের বক্তব্যে মামলার আরজির সাথে বাস্তবতার বিস্তর অমিল এবং এক গভীর ষড়যন্ত্রের চিত্র ফুটে উঠেছে।
উত্তর করফা গ্রাম ও ঝনঝনিয়া এলাকায় গিয়ে সাধারণ মানুষ, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে কথা বললে তাঁরা এই মামলাকে সম্পূর্ণ বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রিপন শেখ বলেন, আমি যতটুকু জানি, নিজাম শেখ অত্যন্ত গরিব ও নিরীহ মানুষ। তাঁকে ফাঁসানোর জন্য পাশের বাড়ির লোকজন এই কাজ করেছে। ফোরকান তো নিজে চোখে তাঁদের আগুন দিতে দেখেনি, কেবল সন্দেহবশত তিন বাপ-বেতার নামে মামলা দিয়েছে। অন্য কেউ শত্রুতা করে নিজামকে বিপদে ফেলে ওই বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার জন্য এসব করছে। আমরা এর সঠিক বিচার চাই।
প্রতিবেশী বাদশা মিয়া শিকদার ও আব্দুল আলী শেখ জানান, ২০১৪ সাল থেকে তাঁরা নিজাম শেখকে চেনেন। দিনমজুরি করে কোনোমতে সংসার চালান, সৎ ও অত্যন্ত অসুস্থ এই মানুষটির পক্ষে এমন অপরাধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে আগুন লাগার পর আসামিপক্ষই প্রথম চিৎকার করে লোক জড়ো করেছিল। একই গ্রামের আরিফুল ইসলাম আরজু বলেন, হঠাৎ আগুন ধরে গেলে ওনারাই (আসামিপক্ষ) চিল্লাপাল্লা শুরু করেন। তা শুনে আমরা এগিয়ে আসি। আসার সময় আশেপাশের লোকজন বলছিল ওপাড়ে যেও না, মামলায় পড়তে পারো। তারপরেও আমরা তিনজন এসে আগুন নিভিয়েছি।
মামলার আরজিতে বাদী দাবি করেছেন, গত ১লা জুলাই ২০২৬ তারিখে আসামিরা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পেট্রোল দিয়ে বাঁশের পাটায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন এবং বাদীকে মারধর করেছেন। তবে বাদীর সাথে সরাসরি কথা বলতে গেলে তাঁর বক্তব্যে ভিন্ন সুর পাওয়া যায়।
বাদী ফোরকান শেখ বলেন, এর আগে আমার ঘেরে বিষ দেওয়া হয়েছিল, মাছ মরেছিল। এবার উনার ছেলে আমাকে হুমকি দিয়েছে, এরপর আবার পাটায় আগুন লেগেছে। যেভাবে হুমকি দিয়েছে আর যেভাবে আগুন ধরিয়েছে, আমার কাছে মনে হচ্ছে তারাই এই কাজ করেছে। অর্থাৎ, বাদী নিজে চোখে দেখার চেয়ে অনুমানের ওপর ভিত্তি করেই মামলাটি দায়ের করেছেন বলে আভাস পাওয়া যায়।
সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি পাওয়া গেছে মামলার সাক্ষীদের বক্তব্যে। মামলার ৩ নম্বর সাক্ষী হাবিবুর তালুকদার-এর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তিনি কীভাবে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হলেন। জবাবে তিনি বলেন, যখন পাটা পুড়ছিল তখন আমি ঘুমে ছিলাম। চিল্লাপাল্লা শুনে ঘুম থেকে উঠে দেখি ওপাড়ে আগুন। ঘুমিয়ে থেকে কীভাবে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হলেন এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।
এদিকে মামলার ৪ নম্বর সাক্ষী ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। তবে তিনি জানান, যেহেতু কোর্টে মামলা হয়েছে, কোর্ট ডাকলে তিনি সেখানেই কথা বলবেন।
মামলার প্রধান আসামি নিজামুদ্দিন শেখ অত্যন্ত অসহায় কণ্ঠে বলেন, আমি মারাত্মক অসুস্থ। ঘটনার মাত্র একদিন আগে ১৪ দিন গোপালগঞ্জ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে বাড়িতে এসেছি। রাত সাড়ে বারোটার দিকে যখন আগুন লাগে, তখন আমরাই চিল্লাপাল্লা করি। আমাদের চিৎকার শুনে আশেপাশের লোক এসে আগুন নিভায়। পাটা কে বা কারা পুড়িয়েছে আমি জানি না। ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমাদের ভিটেমাটি থেকে তাড়াতে এই মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে।
টুঙ্গিপাড়ার শান্ত ও ঐতিহ্যবাহী উত্তর করফা গ্রামে মৎস্য খামারকে কেন্দ্র করে যে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে, তার একটি নিবিড় ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল। বাদীর নিজের জবানবন্দিতে অনুমানের ওপর ভর করা, ৩ নম্বর সাক্ষীর ঘুমিয়ে থাকার পরেও প্রত্যক্ষদর্শী হওয়া এবং স্থানীয়দের স্বতঃস্ফূর্ত বক্তব্য প্রমাণ করে যে, দরিদ্র ও নিরীহ হিসেবে পরিচিত নিজাম শেখ ও তাঁর ছেলেদের ওপর আনীত অভিযোগগুলোর ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং একটি নিরপরাধ পরিবারকে হয়রানি থেকে বাঁচাতে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও আদালতের নিকট ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।