ফেনীর পুরশুরামে কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার হয়ে এক মাস দুইূিন কারাভোগ করা মসজিদের এক ইমাম অবশেষে ডিএনএ পরীক্ষায় নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে কিশোরের ভূমিষ্ঠ সন্তানের জৈবিক পিতা তার আপন বড় ভাই। ভাইকে বাঁচাতে পরিকল্পিতভাবে ওই ইমামকে ধর্ষণ মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলার পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নর উত্তর টেটেশ্বর গ্রামের এক কিশোরী (১৪) ২০১৯ সালে স্থানীয় মক্তবে পড়াশোনা শেষ করে। পাঁচ বছর পর সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে সন্তান প্রসব করলে পরিবারের পক্ষ থেকে ওই মক্তবের শিক্ষক ও স্থানীয় জামে মসজিদের ইমাম মোজাফফর আহমদ (২৫)-এর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়।
২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর কিশোরীর মা বাদী হয়ে পরশুরাম মডেল থানা-এ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। অভিযোগটি মিথ্যা দাবি করে একই বছরের ২৬ নভেম্বর মোজাফফর আহমদ ফেনীর আদালতে পাল্টা মামলা করতে গেলে আদালত প্রাঙ্গণ থেকেই তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে তিনি ১ মাস ২ দিন কারাভোগের পর মোজাফফর জামিনে মুক্তি পান।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মামলার অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর অভিযুক্ত মোজাফফর আহমদ ও কিশোরীর সংরক্ষিত ভ্যাজাইনাল সোয়াব ঢাকার মালিবাগে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভ্যাজাইনাল সোয়াবে কোনো পুরুষের বীর্যের উপস্থিতি শনাক্ত হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়। ফলে মোজাফফরের ডিএনএ’র সঙ্গে তুলনামূলক মতামত দেওয়া সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে কিশোরী ও তার ভূমিষ্ঠ শিশু কন্যার জৈবিক পিতা শনাক্তে নতুন করে ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করে পুলিশ। তদন্ত চলাকালে জিজ্ঞাসাবাদে একপর্যায়ে কিশোরী স্বীকার করে, তার আপন বড় ভাই দীর্ঘদিন ধরে তাকে ধর্ষণ করে আসছিল। ঘটনাটি আড়াল করতে পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় মসজিদের ইমাম মোজাফফর আহমদকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করেন বলে তদন্তে উঠে আসে।
এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ১৯ মে কিশোরীর অভিযুক্ত বড় ভাইকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি আপন বোনকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন।
আদালতের নির্দেশে একই বছরের ৪ আগস্ট কিশোরী, তার শিশু কন্যা এবং বড় ভাইয়ের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। পরে ৯ আগস্ট প্রকাশিত ডিএনএ প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়, অভিযুক্ত বড় ভাইয়ের সঙ্গে শিশুটির জৈবিক পিতা হিসেবে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মিল পাওয়া গেছে। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এ ঘটনায় কারাভোগ করা মোজাফফর আহমদ শিশুটির জৈবিক পিতা নন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পরশুরাম মডেল থানা পুলিশের উপপরিদর্শক শরীফ হোসেন অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে আনীত ধর্ষণের অভিযোগের সত্যতা মেলেনি। এ কারণে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯(১) ধারার মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
অপরদিকে, ওই কিশোরীর ভাইয়ের বিরুদ্ধে একই ধারায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি ফেনী জেলা কারাগার-এ রয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মোজাফফর আহমদ বলেন, “আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ হয়েও কারাভোগ করেছি। এ ঘটনায় সামাজিকভাবে অপমানিত হয়েছি, মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি হারিয়েছি। মামলার খরচ চালাতে বাড়ির পাশে থাকা জমিও বিক্রি করতে হয়েছে। মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত ছিলাম যে এতদিন বিষয়টি কাউকে বলতে পারিনি। এখন বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় মানুষ সত্য জানতে পারছে। আমি কারাভোগ, সামাজিক মর্যাদাহানি ও আর্থিক ক্ষতির ন্যায়বিচার।
এ ঘটনায় আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতির ন্যায়বিচার দাবি করেছেন নির্দোষ প্রমাণিত ইমাম মোজাফফর আহমেদ।
মোজাফফর আহমেদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুল আলিম মাকসুদ বলেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কাউকে দোষী আখ্যা দিলে একজন নিরপরাধ মানুষের জীবনে কতটা ভয়াবহ পরিণতি নেমে আসতে পারে, এ ঘটনাই তার প্রমাণ। পরিকল্পিতভাবে এক নির্দোষ ইমামকে ফাঁসিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। ডিএনএ পরীক্ষার মতো বৈজ্ঞানিক তদন্ত না হলে প্রকৃত অপরাধী হয়তো আড়ালেই থেকে যেত। এ ঘটনা সমাজের জন্য বড় ধরনের
পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, “শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, ডিএনএ রিপোর্টসহ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ যাচাই করেই পুলিশ গুরুত্বসহকারে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। ফরেনসিক পরীক্ষায় প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হওয়ায় অভিযুক্ত ইমামকে অভিযোগপত্র থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর অভিযোগ সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং নিরপরাধ মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হয়। তাই যেকোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে সত্যতা যাচাই অত্যন্ত জরুরি।”