কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সীমান্তবর্তী শিলখুড়ি ইউনিয়নের শালজোড় এলাকার কয়েক হাজার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একটি সেতুর অভাবে চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন। কালজানী নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন এই জনপদের বাসিন্দারা প্রায় ৫০০ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতু না থাকায় প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় পারাপার করে হাট-বাজার, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা সদর ও জেলা শহরে যেতে হয়। এতে সময় অপচয়ের পাশাপাশি বাড়ছে আর্থিক ক্ষতি।
এলাকাবাসী জানান, যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সবক্ষেত্রেই তারা পিছিয়ে পড়ছেন। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও জটিল হয়ে উঠছে। কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারে না। সীমান্তবর্তী হওয়ায় নদীপথ ব্যবহার করে মাদক ও চোরাচালানের ঝুঁকিও বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ এলাকায় তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি উচ্চ বিদ্যালয় ও একটি মাদ্রাসা থাকলেও শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নৌকা পারাপারের কারণে অনেক সময় শিক্ষকরা সময়মতো শ্রেণিকক্ষে পৌঁছাতে পারেন না, ফলে পাঠদান ব্যাহত হয়।
স্থানীয় শিক্ষার্থী রাব্বি হোসেন বলেন, “প্রতিদিন নৌকায় নদী পার হয়ে স্কুল-কলেজে যেতে হয়। বর্ষাকালে ভয় আরও বেশি থাকে। অনেক সময় নৌকা না পেয়ে ক্লাস মিস করতে হয়। একটি সেতু হলে আমাদের কষ্ট অনেক কমে যাবে।”
শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেন, “মেয়েদের জন্য যাতায়াত আরও কষ্টকর। অনেক পরিবার দূরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে চায় না, ফলে অনেক মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।”
ব্যবসায়ী আব্দুল করিম জানান, হাটে পণ্য নিতে অতিরিক্ত খরচ হয়। নৌকা, ভ্যান ও অন্যান্য পরিবহন মিলিয়ে লাভের তুলনায় ব্যয় বেশি হয়ে যায়। কৃষক আব্দুল খালেক বলেন, ফসল বাজারে নিতে এবং কৃষি উপকরণ আনতে অতিরিক্ত খরচ হওয়ায় তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
স্থানীয়রা আরও জানান, এ অঞ্চলের অনেক মানুষ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন এবং অনেকে বিদেশে কাজ করছেন। তবুও নিজ এলাকায় সেতুর অভাবে তাদের পরিবারগুলো এখনও যোগাযোগ সংকটে ভুগছে।
আব্দুর রাজ্জাক ও সাবেক ইউপি সদস্য ইসরাফিল হোসেন বলেন, রাতে কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া যায় না; অনেক সময় নদীর ঘাটেই রোগীর মৃত্যু ঘটে।
শহীদ আলী বলেন, “বর্ষাকালে সন্তানদের নৌকায় নদী পার হতে দেখে আতঙ্কে থাকতে হয়। একটি সেতু হলে এই ভয় দূর হতো।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতু না থাকায় বিয়ে-শাদি, জরুরি নাগরিক সেবা এবং অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনায়ও চরম সমস্যার মুখে পড়তে হয়।
কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, নদীবিচ্ছিন্ন এলাকার মানুষের এই দাবিটি দীর্ঘদিনের। তবে আপাতত নাগেশ্বরীর কালীগঞ্জ সেতুর কাজ শেষ হলে পরবর্তীতে শালজোড় এলাকার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তিনি আরও বলেন, “এটি ব্যয়বহুল প্রকল্প, তাই পরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে হয়।”
শালজোড়বাসীর একটাই দাবি—কালজানী নদীর ওপর দ্রুত ৫০০ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণ করে তাদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটানো হোক।