আকস্মিক বন্যার তীব্র স্রোতে নওগাঁর রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলার সংযোগস্থলে অবস্থিত বান্দাইখাড়া বয়তুল্ল্যাহ সেতুর উত্তর পাশের এপ্রোচ সড়কে ভয়াবহ ধস দেখা দিয়েছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ এ সেতুটি এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনার পাশাপাশি চার উপজেলার সংযোগ স্থলের লাখো মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
আত্রাই নদীর ওপর নির্মিত এই সেতুর দক্ষিণ প্রান্ত আত্রাই উপজেলার বান্দাইখাড়া বাজার এবং উত্তর প্রান্ত রাণীনগর উপজেলার জামালগঞ্জ বাজারে অবস্থিত। প্রতিদিন এই সেতু দিয়ে রাণীনগর, আত্রাই, মান্দা এবং পার্শ্ববর্তী রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার হাজার হাজার মানুষ, শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এ সেতু শুধু একটি অবকাঠামো নয়, চার উপজেলার মানুষের অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন যোগাযোগের অন্যতম প্রধান ভরসা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এলজিইডির তত্ত্বাবধানে ২০১৫ সালে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে এপ্রোচ সড়ক, সেতুর রং এবং নদীভাঙন প্রতিরোধে ব্লক স্থাপনসহ সংস্কারকাজও করা হয়। কিন্তু চলমান বন্যার অতিরিক্ত স্রোতে সেতুর উত্তর পাশের এপ্রোচ সড়কের নিচের মাটি সরে গিয়ে বড় ধরনের ধসের সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে কার্পেটিংয়ের একটি অংশ ভেঙে পড়েছে এবং চলাচলের রাস্তা বিপজ্জনকভাবে সরু হয়ে গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের নিচের মাটি ধসে বিশাল গর্ত তৈরি হয়েছে। অনেক স্থানে কার্পেটিং ঝুলে রয়েছে। সামান্য অসাবধানতা কিংবা একটি ভারী যানবাহনের চাপেই বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে রাতের বেলায় সড়কটি এখন কার্যত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় যুবক মো. পরশ আলী বলেন, দুই-আড়াই বছর আগেও একই স্থানে ধস হয়েছিল। তখন রাতে মোটরসাইকেল নিয়ে যাওয়ার সময় এক ব্যক্তি গর্তে পড়ে প্রাণ হারান। পরে সাময়িকভাবে মাটি ফেলে সমস্যার সমাধান করা হয়েছিল। কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এবারও যদি দায়সারা সংস্কার করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে।”
আত্রাই উপজেলার হাটকালুপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও উপজেলা বিএনপির প্রবাসী কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন তরফদার বলেন, বান্দাইখাড়া ব্রিজ আমাদের অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগের প্রাণকেন্দ্র। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই পথ ব্যবহার করেন। বর্তমানে ধসে পড়া অংশটি মানুষের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। আর কোনো দুর্ঘটনার অপেক্ষা না করে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই সংস্কার করতে হবে।
রাণীনগর উপজেলার মিরাট ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ও উপজেলা বিএনপির ধর্মবিষয়ক সম্পাদক রাসেল সরকার বলেন, “এই সেতুকে কেন্দ্র করে জামালগঞ্জ ও বান্দাইখাড়া বাজারে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। কিন্তু সড়কের বর্তমান অবস্থা উদ্বেগজনক। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং নওগাঁ-৬ আসনের সংসদ সদস্য শেখ রেজাউল ইসলাম রেজুর নজরে আনা হবে, যাতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
রাণীনগর উপজেলা প্রকৌশলী ইসমাইল হোসেন বলেন, ধসের খবর পাওয়ার পরপরই প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। অতিরিক্ত পানির স্রোতে নিচের মাটি সরে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।
রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রাকিবুল হাসান বলেন, “বান্দাইখাড়া সেতুর পাশের সড়কের ধসকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রকৌশলীকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই সংস্কারকাজ শুরু হবে।”
নওগাঁ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. বদরুদ্দোজা মুঠোফোনে জানান, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও কারিগরি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।