লুকানোকে খুঁজে বের করা, অদেখাকে সমর্থন করা’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ঠাকুরগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে থ্যালাসেমিয়া সচেতনতা বৃদ্ধি ও বাহক শনাক্তকরণ কার্যক্রম। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বংশগত এই রক্তরোগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে থ্যালাসেমিয়ার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যে দিনব্যাপী এ আয়োজন করা হয়।
বৃহস্পতিবার (২১মে) ঠাকুরগাঁও শহরের গোবিন্দনগর এলাকায় ইএসডিও’র প্রধান কার্যালয়ে একর্মসূচির আয়োজন করে ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)। সহযোগিতায় ছিল বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি (বিটিএস)। এতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তজনিত রোগ, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত দুইজন বাহকের মধ্যে বিয়ে হলে তাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়। অথচ সময়মতো পরীক্ষা ও সচেতনতার মাধ্যমে এ ঝুঁকি অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বক্তারা আরও বলেন, বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা এখন সময়ের দাবি। এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তরুণদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে পারলে ভবিষ্যতে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলেও মত দেন তারা।
অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীরা থ্যালাসেমিয়া, রক্তস্বল্পতা ও বিভিন্ন রক্তজনিত রোগ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছে নানা প্রশ্ন করেন। চিকিৎসকেরা তাদের প্রশ্নের উত্তর দেন এবং স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক পরামর্শ প্রদান করেন।
এসময় উপস্থিত ছিলেন, রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের হেমাটোলজি ও বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক এম এ খান, ঢাকা মেডিকেল কলেজের হেমাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাফরুহা আক্তার, জাতীয় নাক-কান-গলা ইনস্টিটিউটের হেমাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নাসিব মোহাম্মদ ইরশাদুল্লাহ এবং বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতির নির্বাহী পরিচালক ডা. এ কে এম একরামুল হোসেন।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইকো পাঠশালা অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. সেলিমা আখতার, প্রভাষক আলী আকবর বাবুসহ স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের হেমাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাফরুহা আক্তার বলেন, দেশে এখনও থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে পর্যাপ্ত সচেতনতা তৈরি হয়নি। অনেকেই জানেন না যে তারা এই রোগের বাহক। ফলে অজান্তেই দুইজন বাহকের মধ্যে বিয়ে হচ্ছে এবং জন্ম নিচ্ছে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশু। থ্যালাসেমিয়া কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়, এটি সম্পূর্ণ বংশগত। তাই সময়মতো পরীক্ষা ও সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া এ রোগ প্রতিরোধের বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানো গেলে তরুণদের মধ্যে এ বিষয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে পরিবারগুলো সচেতন হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই জটিল রোগের ঝুঁকি থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে আগে তাদের অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা ছিল না। এই আয়োজনের মাধ্যমে তারা প্রথমবারের মতো জানতে পেরেছেন যে থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তরোগ এবং অসচেতনতার কারণে অনেক মানুষ অজান্তেই এর বাহক হয়ে থাকেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছ থেকে সরাসরি তথ্য ও পরামর্শ পেয়ে তারা বিষয়টি সম্পর্কে আরও সচেতন হয়েছেন।
তারা আরও বলেন, শুধু বইয়ের পড়াশোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এ ধরনের স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক আয়োজন তরুণদের বাস্তব জীবনে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। বিশেষ করে বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা কতটা জরুরি, সেটি তারা এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন।