নেত্রকোনার সীমান্তঘেঁষা কলমাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল হাসেমকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি কথিত অডিও রেকর্ডকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
বিতর্কিত ওই অডিও ভাইরাল হওয়ার পর রবিবার (৩১ মে) তাকে প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত (ক্লোজড) করা হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ২৪ দিনের মাথায় তাকে এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হলো।
নেত্রকোনার পুলিশ সুপার তরিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে সাংবাদিকদের জানান, ওসি মো. আবুল হাসেমকে জেলা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভাইরাল হওয়া অডিওর সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জানা গেছে, শনিবার (৩০ মে) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি কথিত অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিষয়টি জেলা পুলিশের নজরে আসে। অডিওতে সীমান্ত এলাকার পুলিশি দায়িত্বকে “এক ধরনের ব্যবসা” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে শোনা যায়।
ভাইরাল অডিওতে আর্থিক লেনদেন, টাকার ভাগবাটোয়ারা এবং অধস্তন সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে চলার বিষয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। সেখানে সীমান্ত এলাকায় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সবাইকে সমন্বয়ের মাধ্যমে চলার কথা বলা হয় এবং থানার কাউকে তার প্রাপ্য ‘হক’ থেকে বঞ্চিত করা হবে না বলেও আশ্বস্ত করার বিষয়টি উঠে আসে।
এছাড়া গোপনে অর্থ লেনদেন না করার সতর্কতা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সন্তুষ্ট রাখার প্রসঙ্গ এবং ওসির অনুমতি ছাড়া কোনো কার্যক্রম পরিচালনা না করার নির্দেশনার কথাও অডিওতে শোনা যায়। কথোপকথনের বিভিন্ন অংশে ধর্মীয় প্রসঙ্গ এবং কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বদলির ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যও রয়েছে।
তবে শুরু থেকেই ভাইরাল অডিওটির সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন ওসি মো. আবুল হাসেম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “এই অডিও বা কথোপকথনের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এমন কোনো কথা আমি বলিনি। কারা কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এটি তৈরি করেছে, সেটিও আমার জানা নেই। একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাকে হেয় করার জন্য এ কাজ করেছে।”
অডিও ফাঁসের ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয় সচেতন মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকের মতে, কথোপকথনের ধরন বিশ্লেষণ করলে এটি থানার অভ্যন্তরীণ কোনো ব্রিফিং বা অফিসিয়াল বৈঠকের অংশ বলে মনে হয়। সাধারণত এ ধরনের বৈঠকে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য ছাড়া বাইরের কারও উপস্থিতির সুযোগ থাকে না।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি এটি থানার অভ্যন্তরীণ বৈঠকের অডিও হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কীভাবে রেকর্ড করা হলো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল? এ ঘটনায় থানার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ, চেইন অব কমান্ড এবং সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, কলমাকান্দা থানাকে ঘিরে বিতর্কের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে গত ৫ মে চোরাই পথে আনা ভারতীয় প্রসাধনী ছাড়িয়ে নিতে ঘুষের দরকষাকষির একটি কথিত কল রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ঘটনায় থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবু হানিফাকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয় এবং পরদিন তৎকালীন ওসি মো. সিদ্দিক হোসেনকে বদলি করা হয়।
পরে ৭ মে নতুন ওসি হিসেবে কলমাকান্দা থানায় যোগ দেন মো. আবুল হাসেম। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ২৪ দিনের মাথায় তাকেও প্রত্যাহারের মুখে পড়তে হয়েছে।
এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে একই থানায় পরপর দুটি অডিও ফাঁসের ঘটনা এবং দুজন ওসির প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পুলিশের ভাবমূর্তি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে অডিওটির প্রকৃত উৎস এবং ঘটনার নেপথ্যের সত্যতা উদ্ঘাটনের অপেক্ষায় রয়েছেন কলমাকান্দাসহ পুরো নেত্রকোনা জেলার মানুষ।