এসএসসি পরীক্ষা এখনো শেষ হয়নি। সামনে রয়েছে ব্যবহারিক পরীক্ষা। স্বপ্ন, আশা আর সম্ভাবনায় ভরা জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে ছিল ষোড়শী তাওহীদা জান্নাত। কিন্তু সেই জীবনযুদ্ধের শুরুতেই কেন সে বেছে নিল মৃত্যুর পথ? কী এমন কষ্ট ছিল তার মনে, যে বয়সে গলায় পরার কথা ছিল সাফল্যের মালা, সেই বয়সেই তাকে বরণ করতে হলো মৃত্যুর নির্মম পরিণতি?
বিয়ানীবাজারজুড়ে এখন ঘুরপাক খাচ্ছে এসব প্রশ্ন। ঘটনার চার দিন পেরিয়ে গেলেও তাওহীদার আত্মহত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটিত হয়নি। ফলে রহস্য আরও গভীর হচ্ছে।
তাওহীদা জান্নাত বিয়ানীবাজার উপজেলার মাথিউরা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী এবং পশ্চিমপার এলাকার বাসিন্দা ইকবাল হোসেনের মেয়ে। ঈদের পরদিন শুক্রবার রাত প্রায় ৮টার দিকে নিজ ঘরে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় তাকে দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য প্রেরণ করে।
তদন্তের অংশ হিসেবে তাওহীদার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন জব্দ করেছে পুলিশ। জানা গেছে, ফোনটিতে কোনো সিম কার্ড না থাকলেও সে নিয়মিত হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করত। মৃত্যুর আগে কার সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছিল, কার সঙ্গে বেশি কথা হতো কিংবা কোনো মানসিক চাপে ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একাধিক সূত্রের দাবি, তাওহীদার ফোন থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন তদন্তকারীরা। একই সঙ্গে নিহতের বাবা পুলিশের কাছে একজন সন্দেহভাজনের নামও উল্লেখ করেছেন বলে জানা গেছে। ওই ব্যক্তিকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে তথ্য মিলেছে।
তবে মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় এখনো থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করেননি বাবা ইকবাল হোসেন। পেশায় কৃষক ইকবাল হোসেন বলেন, “পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে। বিস্তারিত তারাই বলতে পারবে। আমি চাই না একটি ঘটনার কারণে আমার অন্য সন্তানদের কোনো সমস্যা হোক।”
তিনি আরও জানান, ঘটনার রাতে তার ঘর থেকে কাউকে বেরিয়ে যেতে দেখেননি।
এদিকে এলাকাজুড়ে ঘটনাটি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে হবে। যদি আত্মহত্যার পেছনে কারও প্ররোচনা বা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড জড়িত থাকে, তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ওমর ফারুক বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। আমরা সবদিক বিবেচনায় নিয়ে কাজ করছি। তদন্তের মাধ্যমে আত্মহত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা হবে।”
আত্মহত্যার সামাজিক ও মানসিক দিক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সুজন সভাপতি ও কলামিস্ট অ্যাডভোকেট মো. আমান উদ্দিন বলেন, “প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলে অনেক সময় মানুষ হতাশায় আক্রান্ত হয়। নেতিবাচক চিন্তা যখন প্রবল হয়ে ওঠে, তখন জীবনের অর্থবোধ কমে যেতে পারে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক সংকট অনেক সময় পরিবার বা সমাজের চোখ এড়িয়ে যায়, যার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।”
তাওহীদার মৃত্যুর পেছনে কি ব্যক্তিগত কোনো বেদনা কাজ করেছে, নাকি এর আড়ালে রয়েছে অন্য কোনো অজানা ঘটনা—সেই উত্তর এখনো অমীমাংসিত। পরিবারের কান্না, সহপাঠীদের শোক আর এলাকাবাসীর অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সবাই। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই রহস্যের জট খুলছে না।