ঘরের নিত্যদিনের কাজ ও সন্তান লালন-পালনের পারিবারিক দায়িত্ব সামলে ভোর হতেই কাদা-মাটির বিস্তৃত মাঠে ছুটতে হয় তাদের। পুরুষদের পাশাপাশি মাঠের কঠিন কৃষিকাজে সমান শ্রম দিয়ে পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি ধরে রাখলেও মিলছে না তাদের ঘামের সঠিক মূল্য। হাওরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামের আদিবাসী নারীরা বছরের পর বছর ধরে কৃষিখাতে চরম এই মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
সরেজমিনে বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নের মাটিয়ারবন্দ গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, একদল আদিবাসী নারী কাদা-পানিতে নেমে চুক্তিভিত্তিক ধানের চারা রোপণের কাজ করছেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারাদিন কড়া রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে পুরুষ শ্রমিকদের সমান পরিশ্রম করছেন তারা। তবে দিনশেষে পারিশ্রমিক পাওয়ার বেলায় দেখা যায় বড় ধরনের বৈষম্য। পুরুষ শ্রমিকদের পুরো মজুরি দেওয়া হলেও নারী শ্রমিকদের হাতে তুলে দেওয়া হয় তুলনামূলক বেশ কম টাকা।
আক্ষেপ প্রকাশ করে স্থানীয় বাকাতলা গ্রামের নারী শ্রমিক সমিতি হাজং, মাটিয়ারবন্দ গ্রামের ললিতা হাজং ও কান্দাপাড়া গ্রামের সুষমা হাজং বলেন, আমরা মাঠে পুরুষদের সমান কাজ করি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের চেয়েও বেশি সময় ও মনোযোগ দিয়ে কাজ করি। অথচ দিনশেষে আমাদের হাতে পুরুষ শ্রমিকদের চেয়ে কম টাকা তুলে দেওয়া হয়। সংসার চালাতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে, কিন্তু পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে এই কম পারিশ্রমিকেই মাঠে নামতে হচ্ছে। আমরা আমাদের কাজের ন্যায্য পাওনা ও সমান মজুরি চাই।
স্থানীয় কৃষক মোঃ জালাল উদ্দীন ও মন্তাজ মিয়া স্বীকার করেন যে, আদিবাসী নারী শ্রমিকরা কৃষিকাজে অত্যন্ত দক্ষ, পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল। তবে নারী-পুরুষের মজুরির এই তফাতকে তারা বছরের পর বছর ধরে চলে আসা সামাজিক ‘প্রচলিত নিয়ম’ হিসেবেই দেখছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে সমাজে এই ধারা চালু থাকায় সহজে এটি বদলানো যাচ্ছে না। অন্যদিকে চরম অর্থনৈতিক অসহায়ত্বের কারণে নারীরাও কোনো প্রতিবাদ না করে কম মজুরিতে কাজ মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
আদিবাসী উন্নয়ন সংগঠনের মতে, শ্রম আইন অনুযায়ী সমকাজের জন্য সমান মজুরি পাওয়া প্রতিটি শ্রমিকের মৌলিক অধিকার। আদিবাসী নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা গেলে কেবল তাদের পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার মানই উন্নত হবে না, বরং স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতিও আরও গতিশীল ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
মধ্যনগর উপজেলা আদিবাসী সংগঠন ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান অজিত হাজং জানান, পুরুষদের তুলনায় নারী শ্রমিকরা একই কাজের জন্য গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত কম মজুরি পান। এই বৈষম্য দূর করতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলে দাবি জানানো হলেও নিয়োগদাতাদের অনীহা এবং শ্রমিকদের চরম দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না।
এ বিষয়ে মধ্যনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আসয়াদ বিন খলিল রাহাত জানান, হাওরাঞ্চলের কৃষিতে আদিবাসী নারী শ্রমিকদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমকাজের বিপরীতে সমমজুরি নিশ্চিত করা জরুরি। নারী শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা প্রদান ও বৈষম্য নিরসনে কৃষক এবং নিয়োগদাতাদের সচেতন করতে কৃষি বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।