শিরোনাম :
ভৈরবে ভোজ্য তেলে অনিয়ম: প্রশাসনের অভিযানে জরিমানা ঠাকুরগাঁওয়ে নিজ বাড়ী থেকে মাদকসহ স্বামী-স্ত্রী গ্রেপ্তার টুঙ্গিপাড়ায় সরকারি জমি দখল করে পাকা স্থাপনা—প্রশাসনের নীরবতায় প্রশ্নের ঝড় শ্রীপুরে মাদ্রাসার ছাত্রীকে অপহরণে গ্রেফতার ৭ জনগণের আস্থাই সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন, ড. আসিফ মিজান বাগেরহাটে লক্ষ্মীখালী ব্রিজের নির্মাণকাজ শুরুর দাবিতে মানববন্ধন ভৈরবে গভীর রাতে বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাট; থানায় অভিযোগ ঠাকুরগাঁওয়ে পাম্পে তেল নিতে গিয়ে হাতাহাতি মহাসড়ক অবরুদ্ধ কুলিয়ারচরে ২ কেজি গাঁজাসহ এক নারী মাদক ব্যবসায়ী আটক গোপালগঞ্জে বৃদ্ধ নাহিদা হত্যা মামলার প্রধান আসামি গ্রেফতার
মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১৮ অপরাহ্ন

চরমপন্থী নেতা নুরুজ্জামান লাল্টুর ইন্তেকাল: আত্মসমর্পণ থেকে কারাজীবন—এক আলোচিত জীবনের গল্প

Ahsanul hoque / ৮৫ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

চরমপন্থী নেতা নুরুজ্জামান লাল্টুর ইন্তেকাল: আত্মসমর্পণ থেকে কারাজীবন—এক আলোচিত জীবনের গল্প
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আলোচিত চরিত্র, চরমপন্থী নেতা এবং চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার কয়রাডাঙ্গা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান লাল্টু আজ ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর জীবনের পথচলা ছিল বৈপরীত্যে ভরা—একদিকে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় অধ্যায়, অন্যদিকে স্বাধীনতার পর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে দীর্ঘ পলাতক জীবন ও কারাবাস।
স্বাধীনতার পর তিনি সন্ত্রাসী জীবন বেছে নেওয়ায় দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন। পরবর্তীতে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘ কারাজীবন কাটান। তবে তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ১৯৯৯ সালের ২৯ জুলাই। সেদিন নিজ গ্রাম কয়রাডাঙ্গায় সহকর্মীদের নিয়ে পুলিশের কাছে শতাধিক অস্ত্র ও কয়েকশ রাউন্ড গুলিসহ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন নুরুজ্জামান লাল্টু। ১৯ বছর কারাভোগের পর ২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি মুক্তি পান।
সেই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত ছিলাম। যশোর থেকে বাসে প্রথমে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ, সেখান থেকে আবার বাস বদলে চুয়াডাঙ্গা শহরে পৌঁছাই। কিন্তু সেখান থেকে কয়রাডাঙ্গা গ্রামে যাওয়ার কোনো যানবাহন পাওয়া যাচ্ছিল না। বাধ্য হয়ে বেশি ভাড়ায় একটি থ্রি-হুইলার ভাড়া করি। সঙ্গে ছিলেন দৈনিক জনকণ্ঠ খুলনা অফিসের ফটোগ্রাফার ফাইয়াজ হোসেন পলাশ।
মেহেরপুর সড়ক ধরে এগোতে এগোতে ভালাইপুর মোড়ে পৌঁছাই—যেখান থেকে ডানে মোড় নিয়ে যেতে হয় কয়রাডাঙ্গায়। মোড়ে একটি ইটের ভাটা, বর্ষা মৌসুম হওয়ায় সেটি বন্ধ ছিল। স্থানীয়রা জানান, এই ভাটায় নাকি বহু মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল নুরুজ্জামান লাল্টুর নির্দেশে—যা তাঁর জীবনের অন্ধকার অধ্যায়ের নির্মম স্মারক হয়ে আছে।
গ্রামে পৌঁছে দেখা গেল আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের স্থলে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ। পুলিশের সহযোগিতায় ভেতরে প্রবেশ করে যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা ছিল অভাবনীয়। লম্বা পাটিতে বসে আছেন নুরুজ্জামান লাল্টু, তাঁর ভাইপো বিপ্লব, দীপুসহ শতাধিক চরমপন্থী। সামনে সাজানো শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র ও কয়েকশ রাউন্ড গুলি। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি লুৎফুল কবীর।
আত্মসমর্পণের সময় নুরুজ্জামান লাল্টু সরকারের কাছে লিখিতভাবে প্রায় ১৬টি দাবি পেশ করেন। এর মধ্যে ছিল—কয়রাডাঙ্গা গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ, টেলিফোন লাইন স্থাপন, কাঁচা রাস্তা পাকা করা ইত্যাদি উন্নয়নমূলক দাবি। এসব দাবি লিফলেট আকারে উপস্থিত সাংবাদিকদের হাতে তুলে দেন গ্রামবাসীরা।
ফেরার পথেও কম বিড়ম্বনা পোহাতে হয়নি। একই থ্রি-হুইলারে চুয়াডাঙ্গা শহরে ফিরে আসি। তখন চুয়াডাঙ্গায় দৈনিক জনকণ্ঠের রিপোর্টার ছিলেন মামুন ভাই। তিনি একটি স্থানে নিয়ে যান, সেখান থেকে আমার ভাই শামছুর রহমান কেবল ভাইকে ফোনে বিষয়টি জানাই। তিনি সংবাদ তৈরি করেন। ফোনেই সংবাদ পাঠানো হয়। এরপর চুয়াডাঙ্গা থেকে বাসে ঝিনাইদহ, সেখান থেকে গড়াই বাসে যশোরে ফিরতে রাত সাড়ে ৮টা বেজে যায়।
এদিকে পলাশ ভাইয়ের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। রাত বেশি হওয়ায় খুলনায় তখন ছবি প্রিন্ট করার প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। তাই যশোর শহরের জেস টাওয়ারে অবস্থিত ‘ওশিন কালার ল্যাব’-এ গিয়ে ছবি প্রিন্ট করা হয়। পরে পলাশ ভাইকে মনিহারের সামনে নামিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে তিনি ঢাকা থেকে খুলনাগামী ঈগল পরিবহনের বাসে করে খুলনার উদ্দেশে রওনা হন। যশোর থেকে সংবাদ পাঠান শামছুর রহমান কেবল ভাই, আর খুলনা থেকে ছবি পাঠান পলাশ ভাই। পরদিন দৈনিক জনকণ্ঠের প্রথম পাতায় চার কলামে সংবাদটি প্রকাশিত হয়।
নুরুজ্জামান লাল্টুর জীবন ছিল এক জটিল ও বিতর্কিত অধ্যায়। একজন মুক্তিযোদ্ধা কেন সন্ত্রাসের পথে গেলেন—এ প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক। উল্লেখযোগ্য বিষয়, তাঁর পুরো পরিবারই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সশস্ত্র চরমপন্থায় পা বাড়ানোর সেই অজানা গল্প একদিন হয়তো বিশদভাবে লেখা হবে।
আজ তাঁর ইন্তেকালে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে এক সময়ের আতঙ্ক ও বিতর্কের এই নাম—নুরুজ্জামান লাল্টু।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category