কারবালার শোক, ত্যাগ ও সত্য প্রতিষ্ঠার চেতনা ধারণ করে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে টানা ১৯১ বছর ধরে পালিত হয়ে আসছে পবিত্র আশুরা। হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের স্মরণে প্রতিবছর ১ থেকে ১০ মহররম পর্যন্ত ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, জারি-মার্সিয়া, মাতম, রোজা, তাজিয়া নির্মাণ ও তাজিয়া মিছিলসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী শোকানুষ্ঠান পালিত হয়। ১০ মহররমের পরও আরও দুই দিন লোকজ ঐতিহ্যের আবহে এখানে অনুষ্ঠান চলতে থাকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর অন্যতম সহচর সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (রহ.)-এর বংশধর এবং ‘ভাটির অলী’ হিসেবে খ্যাত ন’কোষা জমিদার হজরত সৈয়দ আব্দুল করিম আল-হোসাইনী (রহ.) (যিনি ‘সৈয়দ আলাই মিয়া সাহেব’ নামে সমধিক পরিচিত), আহলে বাইতের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে জমিদারি ও পার্থিব আভিজাত্য ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ১৮৩৪ সালে নিজ বাড়ির আঙিনায় একটি ইমামবাড়া (হোসাইনী মোকাম) প্রতিষ্ঠা করেন। পরের বছর ১৮৩৫ সাল থেকে সেখানে সীমিত পরিসরে মহররমের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সেই ধারাবাহিকতায় আজও বংশ পরম্পরায় অষ্টগ্রামের এই ঐতিহ্যবাহী আশুরা পালিত হয়ে আসছে।
মহররমের চাঁদ দেখা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হোসাইনী মোকামে লাল-কালো নিশান উত্তোলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। দশ দিনব্যাপী রোজা পালন, খাট-পালং ছেড়ে মাটিতে শয়ন, সাধারণ পোশাক পরিধান, নিরামিষ খাবার গ্রহণ, খালি মাথা ও খালি পায়ে চলাচলসহ নানা ধর্মীয় অনুশাসন পালন করেন ভক্তরা।
প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর মোকামের মিলাদ ঘরে সকাল আটটা পর্যন্ত কারবালার আলোচনা ও জারি পরিবেশন করা হয়। একই সময়ে ভিতর বাড়িতে নারীরাও পৃথকভাবে জারি পরিবেশন করেন। পুরুষেরা বাঁশ, বেত, রঙিন কাগজ ও কাপড় দিয়ে কারবালার স্মৃতিবিজড়িত তাজিয়া তৈরিতে অংশ নেন। আসরের নামাজের পর মাতম ও মার্সিয়া পরিবেশিত হয় এবং মাগরিবের আগে ফাতেহা, দোয়া ও ইফতারের তাবারক বিতরণ করা হয়।
প্রতি ৫ মহররম ২২ মৌজার মাতাব্বরদের নিয়ে ঐতিহ্যবাহী ‘পাঁচ গায়েলা’ পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ৯ মহররম ‘নিশান গাস্ত’ ও রাতে ‘তাজিয়া গাস্ত’ অনুষ্ঠিত হয়। আর আজ ১০ মহররম বিকেলে হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে বর্ণাঢ্য তাজিয়া মিছিল স্থানীয় কারবালা (হাটখলা) প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হবে। সেখানেই তাজিয়া সংরক্ষণের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটবে মূল আনুষ্ঠানিকতার।
অষ্টগ্রামের হোসাইনী মোকামে প্রতিবছর হাজার হাজার মুসল্লি দলবদ্ধভাবে ‘হায় হোসাইন, হায় হাসান’ ধ্বনিতে শোক প্রকাশ করেন। শুধু অষ্টগ্রাম নয়, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, হোসেনপুর, ভাগলপুর ও বৌলাই, নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি ও মদন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল ও নাসিরনগর, সুনামগঞ্জ, সিলেট এবং হবিগঞ্জের সুলতানশী হাবেলীসহ প্রায় ১০১টি গ্রামে একই ধারায় এই শোকানুষ্ঠান পালিত হয়ে আসছে।
অষ্টগ্রাম হাবেলির সন্তান ও সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু বলেন, আমরা হোসাইনপন্থি। সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও অন্যায়ের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শনই মহররমের শিক্ষা। এই শোকানুষ্ঠান মানুষকে ধৈর্য, ত্যাগ, ন্যায়পরায়ণতা ও সত্যের জন্য জীবন উৎসর্গের শিক্ষা দেয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, হজরত মাওলানা সৈয়দ আব্দুল হেকীম আল-হোসাইনী (রহ.) ও বিশিষ্ট লেখক-গবেষক মাওলানা সৈয়দ কুতুব উদ্দিন আহমেদ আল-হোসাইনী চিশতী (রহ.)-এর উত্তরসূরি হিসেবে বর্তমানে সৈয়দ আহমেদুল কবির প্রিন্স এ ঐতিহ্যের দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ ১৯১ বছরের এই ধারাবাহিকতা আজও অষ্টগ্রামের মানুষের ভ্রাতৃত্ববোধ, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও কারবালার চেতনার এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে