গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জাতীয় পরিচয়পত্রের ভুল সংশোধন ও নতুন ভোটার হালনাগাদ করতে আসা সেবাগ্রহীতাদের আটকে রেখে ভয়ভীতি প্রদর্শন, টাকা দাবি এবং নানাভাবে হয়রানি করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নিয়মতান্ত্রিক অনুমতি এবং মাঠ পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহকারী, যাচাইকারী ও শনাক্তকারীর স্বাক্ষর থাকা সত্ত্বেও নাগরিকদের চূড়ান্ত ভোটার হতে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিয়মানুযায়ী সমস্ত বৈধ কাগজপত্র জমা দিয়ে ছবি ও আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) দেওয়ার পর, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা অনিমেষ কুমার বসু তাদের অফিসে ডেকে এনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখছেন। পুলিশে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হচ্ছে এবং টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সার্ভার থেকে তাদের আঙুলের ছাপ ও আবেদন ডিলিট করে দেওয়া হচ্ছে। ‘টাকা না দেওয়ায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট ডিলিট’ সেবা নিতে আসা বোড়াশী ও রঘুনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের একাধিক ভুক্তভোগী জানান, তারা অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ, পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্র, নাগরিকত্ব সনদ ও বিদ্যুৎ বিলসহ সমস্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য সংগ্রহকারীর কাছে জমা দিয়ে গত ০৪-০৩-২০২৫ তারিখে হালনাগাদে আঙুলের ছাপ দেন।
কিন্তু কিছুদিন পর সদর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা অনিমেষ কুমার বসু তাদের ফোনে ডেকে নিয়ে প্রায় ৩ ঘণ্টা আটকে রাখেন। এরপর পুলিশে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করেন। টাকা না দেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের দেওয়া স্লিপ নম্বর নিয়ে সার্ভার থেকে ভোটার ফিঙ্গারপ্রিন্ট ডিলিট করে দেওয়া হয়। অনিমেষ কুমার বসুর বিরুদ্ধে এ ধরনের হয়রানি ও অনিয়মের অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। এর আগে তিনি যখন কাশিয়ানী উপজেলা নির্বাচন অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তখনও তার বিরুদ্ধে গুরুতর হয়রানির অভিযোগ উঠেছিল।কাশিয়ানীতে কর্মরত থাকাকালীন সাকিব নামের এক ভুক্তভোগী তার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক (ডিসি), জেলা নির্বাচন অফিসার এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। ১৬ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এমন হয়রানির শিকার কয়েকজন ভুক্তভোগী হলেন: ১. আলহাজ শেখ (ফরম নম্বর: ১৫৭১৫৯৩৯৫), পিতা: আনিচ শেখ, মাতাঃ আকলিমা বেগম। ২. মাহিম শেখ (ফরম নম্বর: ১৫৭১৫৯৩৯৩), পিতা: মহিবুর শেখ। ৩. আবু মুসা শেখ (ফরম নম্বর: ১৫৭১৫৯৩৯৬), পিতা: মো. মুনসুর শেখ। ৪. মো. নাহিদ শেখ (ফরম নম্বর: ১৫৭১৫৯৩৯৪), পিতা: আনিচ শেখ। ৫. মোঃ আনিচ শরিফ (ফরম নম্বর: ১৫৭১৩০৭৭০), পিতাঃ মোঃ আনিচ শরীফ।
আটকে রেখে ১০ হাজার টাকা দাবিঃ আরেক ভুক্তভোগী মো. আনিচ শরীফ (ফরম নম্বর: ১৫৭১৩০৭৭০, পিতা: আমেজ শরীফ) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন: “আমি ২০২৫ সালের হালনাগাদে ভোটার হই। তিন মাস পর নির্বাচন অফিসার অনিমেষ কুমার বসুর কাছে গেলে তিনি স্লিপ দেখে বলেন, ‘এই ফিঙ্গার হবে না, জন্ম সনদ বাইরের করা।’ এরপর তিনি আমাকে নতুন করে আবেদন করতে বলেন। আমি পুনরায় অনলাইন জন্ম নিবন্ধন, ইউনিয়ন পরিষদের প্রত্যয়নপত্র, হোল্ডিং নম্বরসহ সব দলিল নিয়ে গেলে তিনি আমাকে বলেন, ‘তোমার জন্ম নিবন্ধন বাইরের, তুমি বাংলাদেশের নাগরিক হতে পারবে না।’ আমাকে ৩ ঘণ্টা আটকে রেখে পুলিশে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। পরে আমার মা আমাকে ছাড়িয়ে নিতে অফিসে আসলে ওনার কাছে ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। দালাল চক্রের সিন্ডিকেট ও কর্মকর্তাদের যোগসাজশ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, নির্বাচন কর্মকর্তা কিছু নির্দিষ্ট দালাল চক্র ও অফিসের কর্মচারীদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। প্রকৃত নাগরিকদের বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও দিনের পর দিন ঘোরানো হচ্ছে। অথচ এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে অন্য এলাকার বা প্রশ্নবিদ্ধ জন্ম নিবন্ধন দিয়ে সহজেই নতুন ভোটার করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমান নির্বাচন কর্মকর্তা যোগদানের পর থেকে এই ধরনের অনিয়ম ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ভুক্তভোগীদের ধারণা, এ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক ভোটারের আবেদন পেন্ডিং রাখা হয়েছে কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে।
এসব সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে সদর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা অনিমেষ কুমার বসুর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমের সামনে ভিডিও সাক্ষাৎকার দিতে অস্বীকৃতি জানান।
তিনি বলেন, “আমি কোনো ভিডিও সাক্ষাৎকার দিতে বাধ্য নই। সাক্ষাৎকার দিতে হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগবে।” তবে তার বিরুদ্ধে আনা সকল অনিয়ম ও টাকা দাবির অভিযোগ তিনি মিথ্যা বলে দাবি করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগও জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে বিগত ৭ মাস ধরে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো বহাল তবিয়তে থেকে হয়রানির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী ও গোপালগঞ্জের সাধারণ নাগরিকরা অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে এই কার্যালয়ের নতুন ভোটারদের জন্ম নিবন্ধন ও নথিপত্র পুনঃযাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচন কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।