• মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ১২:১৯ পূর্বাহ্ন

তিন কন্যার পিতার ইতালিতে মৃ’ত্যু, মরদেহ ফেরাতে সহায়তা চায় পরিবার

তরিকুল মোল্লা, বাগেরহাট প্রতিনিধিঃ
প্রকাশকাল : সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

সংসারের অভাব ঘোচানো, তিন কন্যার মুখে হাসি ফোটানো এবং পরিবারের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন নিয়ে ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছিলেন বাগেরহাট সদর উপজেলার বেমরতা ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামের বাসিন্দা জিন্নাত খান খোকন। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথচলা শেষ হয়েছে এক হৃদয়বিদারক পরিণতিতে। ঋণের বোঝা ও হতাশার মধ্যে ইতালিতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন তিনি বলে জানিয়েছে পরিবার ও স্বজনরা।

মৃত জিন্নাত খান খোকন গ্রামের মৃত লুৎফর রহমান খানের ছেলে। তিনি স্ত্রী সুমি বেগম, বড় মেয়ে জেরিন আক্তার (১৪), মেজো মেয়ে জিনিয়া খানম (৮), আড়াই বছরের ছোট মেয়ে জাকিয়া আক্তার এবং ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা জরিনা বেগমকে রেখে গেছেন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, উন্নত জীবনের আশায় দালালের মাধ্যমে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় করে খোকন প্রথমে বৈধভাবে বুলগেরিয়ায় যান। পরে সেখান থেকে ঝুঁকিপূর্ণ পানিপথে অবৈধভাবে ইতালিতে প্রবেশ করেন। বিদেশযাত্রার জন্য তিনি নিজের বসতভিটাসহ পরিবারের শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করে দেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণও নিতে হয়।

স্বজনরা জানান, পরিবারের স্বপ্ন পূরণের আশায় ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দেশ ছাড়েন খোকন। কিন্তু বিদেশে গিয়েও ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি। বরং ঋণের চাপ, অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। একপর্যায়ে ২০২৬ সালের ১৯ জুন, শুক্রবার, ইতালিতে গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে পরিবার খবর পায়।

খোকনের মামাতো ভাই শেখ তানভির হাসান বলেন, বিদেশে যাওয়ার জন্য খোকন নিজের ভিটেমাটিও বিক্রি করেছিল। পরিবারের ভালো ভবিষ্যতের আশায় সে দেশ ছেড়েছিল। কিন্তু ঋণের চাপ ও হতাশাই শেষ পর্যন্ত তার জীবন কেড়ে নিল।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ মহিদুল ইসলাম বলেন, খোকনের পরিবার এখন একেবারেই অসহায় অবস্থায় রয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তারা দিশেহারা। মরদেহ দেশে আনতেও বিপুল অর্থের প্রয়োজন, যা তাদের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।

প্রতিবেশী মো. মিজান বলেন,এলাকার মানুষ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তার চেষ্টা করছেন। তবে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা জরুরি।

মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বৃদ্ধা মা জরিনা বেগম বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। ছেলের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, যাওয়ার সময় আমাকে চুমু খেয়ে বলেছিল, অনেক টাকা দেবে, আমার চিকিৎসা করাবে। কিন্তু আজ আমার ছেলে আর নেই। আমার ছেলে সংসারের সুখের জন্য বিদেশে গিয়েছিল। এখন শেষবারের মতো তার মুখটা দেখতে পারব কি না জানি না। সরকারের কাছে আমার একটাই আবেদন, আমার ছেলের মরদেহ যেন দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়।

স্ত্রী সুমি বেগম বলেন, স্বামীকে বিদেশ পাঠাতে অনেক কষ্ট করেছি, ঋণ করেছি। এখন তার মরদেহ দেশে আনার টাকাও আমাদের নেই। ছোট ছোট তিনটি মেয়েকে নিয়ে কীভাবে জীবন চলবে, সেটাও জানি না।

বাবার মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বড় মেয়ে জেরিন আক্তার বলে, “আমি শুধু চাই, বাবাকে শেষবারের মতো একবার দেখতে। বাবার মরদেহটা যেন দেশে আনা হয়।”

স্বজনরা জানান, ইতালি থেকে খোকনের মরদেহ দেশে আনতে প্রায় ৭ লাখ টাকা প্রয়োজন। কিন্তু অর্থাভাবে সেই টাকা জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রিয়জনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়েও চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে পরিবারের।

এ অবস্থায় স্থানীয়রা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সমাজের বিত্তবান মানুষের প্রতি মানবিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের দাবি, দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হলে পরিবারটি শেষবারের মতো খোকনকে বিদায় জানানোর সুযোগ পাবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category