ভোর তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। পূর্ব আকাশে সূর্যের আভা মাত্র উঁকি দিতে শুরু করেছে। ঠিক সেই সময় রাণীনগর-সাহাগোলা আঞ্চলিক মহাসড়কে দেখা গেল এক ভিন্ন দৃশ্য। শত শত তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরী ও ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ একসঙ্গে ছুটছেন সামনে। কারও চোখে জয়ের স্বপ্ন, কারও মনে সুস্থ জীবনের প্রত্যয়। সেই দৃশ্য যেন শুধু একটি দৌড় প্রতিযোগিতা নয়, বরং মাদক, অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে তারুণ্যের এক নীরব প্রতিবাদ।
নওগাঁর রাণীনগরে অনুষ্ঠিত হয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ রানিং ইভেন্ট ‘রাণীনগর ১০ কিমি’ (সিজন-২)। ‘রাণীনগর ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন’ (রাইডো)-এর আয়োজনে শনিবার (৩০ মে) অনুষ্ঠিত এই ব্যতিক্রমী ক্রীড়া উৎসবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রায় ৩৫টি জেলা থেকে অংশ নেন প্রায় ৭০০ জন পেশাদার ও অপেশাদার দৌড়বিদ।
এক সময় যে জনপদ রাজনৈতিক সভা কিংবা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত ছিল, সেই রাণীনগর এখন ধীরে ধীরে পরিচিতি পাচ্ছে একটি ক্রীড়াবান্ধব ও স্বাস্থ্যসচেতন জনপদ হিসেবে। গত বছরের সফল আয়োজনের ধারাবাহিকতায় এবারের আসর আরও বড়, আরও সুশৃঙ্খল এবং আরও অংশগ্রহণমূলক হয়ে উঠেছে।
সকাল ৬টায় প্রতিযোগিতা শুরু হলে মুহূর্তেই উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। ১০ কিলোমিটার জেনারেল, ৫ কিলোমিটার পুরুষ (বিগিনার), ৫ কিলোমিটার নারী এবং ১ কিলোমিটার কিডস বিভাগে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিযোগিতা। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে স্থানীয় মানুষ করতালি ও শুভকামনায় উৎসাহ জোগান অংশগ্রহণকারীদের। অনেকেই মোবাইল ফোনে ধারণ করেন স্মরণীয় মুহূর্তগুলো।
দৌড় শেষে বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় নগদ অর্থ, মেডেল ও সম্মাননা ক্রেস্ট। তবে পুরস্কারের চেয়েও বড় প্রাপ্তি ছিল অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সুস্থ জীবনযাপন, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া। বিশেষ করে শিশুদের জন্য আলাদা ক্যাটাগরি আয়োজন নতুন প্রজন্মকে ক্রীড়ামুখী করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নওগাঁ-৬ আসনের সংসদ সদস্য এস এম রেজাউল ইসলাম রেজু। তিনি বলেন, “মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গঠনে খেলাধুলার বিকল্প নেই। তরুণদের মাঠে ফিরিয়ে আনতে এবং ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে এমন উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।”
অনুষ্ঠানে প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসান। রাইডোর প্রতিষ্ঠাতা ও চিফ কো-অর্ডিনেটর ডা. মো. রুমন হোসেনের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, ক্রীড়া সংগঠক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
সমাপনী বক্তব্যে ডা. রুমন হোসেন বলেন, “‘রাণীনগর ১০ কিমি’ কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলন। আমরা চাই তরুণরা মাদক নয়, মাঠকে বেছে নিক; হতাশা নয়, স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরুক।”
দিন শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার উঠেছে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত অর্থে জয় হয়েছে সুস্থতা, সচেতনতা ও মানবিক মূল্যবোধের। আর সেই জয়ের সাক্ষী হয়ে ইতিহাসের পাতায় আরেকটি উজ্জ্বল অধ্যায় যোগ করল নওগাঁর রাণীনগর।