রাশি রাশি ভারা ভারা, ধান কাটা হল সারা” এবং “আজই এ প্রভাতে রবির কর কেমনে পশিল প্রাণের পর, কেমনে পলিশ গুহার আঁধারে প্রভাত পাখির গান! এভাবেই বিভিন্ন কবিতা আবৃত্তি মনমুগ্ধকর গান গেয়ে মানুষের উচ্ছ্বাস ও আনন্দ আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে মাতিয়ে তুলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী পালন অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমার বাবা দাপুটে একজন রাজনৈতিক ছিলেন। প্রতিদিন সকালবেলা হাটতে বের হতেন এবং ফিরে এসেই তিনি রবীন্দ্রনাথের শাজাহান কবিতা আবৃত্তি করতেন। “এ কথা জানিতে তুমি, ভারত-ঈশ্বর শা-জাহান, কালশ্রোতে ভেসে যায় জীবন যৌবন ধনমান”। তাঁর এসব কবিতা, পদ্য, গদ্য, নাটক, গান সকল ক্ষেত্রে রবিন্দ্রনাথের অবাধ বিচরণ ছিলো।
তিনি গীতাঞ্জলি লিখে গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। যার ফলে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। সেই জন্য আমার প্রায়ই মনেহয় রবিন্দ্রনাথকে সারাজীবন পড়লেও পড়া যায়না। তাই তাঁর কবিতা আবৃতি করার লোভ সামলাতে পারিনা। “আজই এ প্রভাতে রবির কর কেমনে পশিল প্রাণের পর, কেমনে পলিশ গুহার আঁধারে প্রভাত পাখির গান! না জানি কেন রে এত দিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ, জাগিয়া উঠিল প্রাণ!”
শুক্রবার (৮মে) বেলা সাড়ে ১২ টার দিকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে নওগাঁর আত্রায়ের পতিসর রবীন্দ্র কাচারি বাড়িতে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সহযোগিতায় জেলা প্রশাসন আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানের দুই লাইন বলার পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ন কথা বলেন।
উপস্থিত নারী ও পুরুষদের উদ্যেশে মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, প্রিয় ভাই-বোনেরা আমি কোনো তাত্ত্বিকও নই, কোনো পন্ডিতও নই। সাহিত্যের উপর বিশেষ কোনো পাণ্ডিত্য নাই। রবিন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্যসহ সব ধরনের সাহিত্যই আমি ভালোবাসি। কিন্তু আমি নিজে কোনো কিছু লিখতে পারিনা। আসলে যে মানুষ সাহিত্য চর্চা করে, কবিতা শুনে, কবিতা লিখে অথবা যে মানুষটি গান শুনে, গান গায় সে নিঃসন্দেহে ভালো মানুষ হয়।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিশ্বকবির কর্মজীবনের বিরল স্থান এই পতিসর। আর এই পতিসরে ১৬৫তম জন্মবার্ষিকীতে আসার লোভটা সামলাতে পারিনি। আপনাদের এলাকার এমপি যখন আমাকে বললো, তখন আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়েছি। কারণ এখানে ২২বছর আগে একবার এসেছিলাম। সেই জন্য আমি লোভ সামলাতে পারিনি।
তিনি আরও বলেন, যেখানে রবীন্দ্র তাঁর জীবনের একটি নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন। রবিন্দ্রনাথ এখানে যখন আসতেন তিনি কৃষকদের দুঃখ দূর্দশা দেখে ব্যাংক স্থাপন করেছিলেন। কৃষিকে আধুনিক করার জন্য আধুনিক পদ্ধতিতে কৃষি কাজ শুরু করেছিলেন৷ শুধু তাই নয়, তিনি একটা কৃষি ইন্সটিউট শুরু করেছিলেন। এটি তার জীবনের এবং কাজের সঙ্গে কবিতার বাইরের ব্যাপার ছিলো।
মহাসচিব বলেন, আমি ২২ বছর পর এলেও ঠিক তেমন কোনো পরিবর্তন দেখলাম না। প্রায় একই রকম। রাস্তার দুই পাশে সেই ধানে ক্ষেত, ধান এখন পাঁকছে, কাটার জন্য তৈরি হয়ে গেছে, কোথাও কাটাও হচ্ছে। তখন আমার মনে পড়ল সেই কথা-“রাশি রাশি ভারা ভারা, ধান কাটা হল সারা”। এই উপলব্ধি গুলো কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভিতর থেকে আমাদের উদ্যেশে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, রবীন্দ্রনাথকে অনেকে মনে করেন কিছুটা সাম্প্রদায়িক ধাচের চিত্রিত করে, কিন্তু আমি মনে করি সেখানে তাদের জ্ঞানের অভাব আছে, অনুভবের অভার আছে এবং তারা পরিস্কার করে বোঝেন না। রবীন্দ্রনাথ আসলে বিশ্বমানবতার কবি। এবং তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের জীবনকে সেইভাবে সাজাতে পারি। তাঁর একটি গান আমার খুব পছন্দ হয়, “আনন্দ ধারা বহিছে ভুবনে” এই গানটা অপূর্ব সুন্দর। তার মধ্যে একটা কথা আছে “চারেদিকে দেখ চাহি নয়ন মেলিয়া, ক্ষুদ্র দু:খ সবই তুচ্ছ মাহি!”
তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ বাঙ্গালীদের সমালোচনা করতেও কিন্তু ছাড়েননি। তিনি তাঁর দুরন্ত আশা কবিতার মধ্যে বলেছেন. “কাগজ নেড়ে উচ্চস্বরে পলিটিকাল তর্ক করে মাথায় ছোট বহরে বড় বাঙ্গালী সন্তান। ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুইন।। চরণতলে বিশাল মরু দিগন্তে বিলীন। ছুটেছে ঘোড়া, উড়েছে বালি, চলো সিঁড়ি সিঁড়ি “ এই কবিতার ভিতরের যে কথা এতেই তিনি দার্শনিক।
রাজনীতি প্রসঙ্গে ফকরুল বলেন, ভাই ও বোনেরা আমরা রাজনীতি করি, সারাজীবন রাজনীতির মধ্যে কাটিয়ে দিয়েছে। আমাদের দেশের রাজনীতি সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন না। বারবার এখানে মানুষেরা পরিবর্তনের জন্য লড়ায় করেছে, যুদ্ধ হয়েছে, প্রাণ দিয়েছে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছে। কিন্তু দূর্ভাগ্যক্রমে পরিবর্তন আসেনি।
মহসচিব বলেন, আমি আত্রাই জনগণকে একটু ভিন্নভাবে চিনি। এই আত্রাইয়ের মানুষ বিপ্লবী মানুষ। আত্রাইয়ের মানুষ একদিকে পাকিস্থানে বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার যুদ্ধ করেছে অন্যদিকে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধেও তারা যুদ্ধ করেছে। কাজেই আমরা সমস্ত হানাদার বাহীনির বিরুদ্ধে, আমরা আধিপত্যের বিরুদ্ধে। আমরা মাথা উঁচু করে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকতে চাই। কাজেই আমাদের নেতা তারেক রহমান বলেছেন সবার আগে বাংলাদেশ। এই কথা মধ্যে অনেক তাৎপর্য আছে।
অথচ আমাদের কেউ বলে ভারতের পক্ষে, আবার কেউ বলে পাকিস্থানের পক্ষে, মার্কিনীদের পক্ষে। আমরা শুধু বাংলাদেশের পক্ষে। এমনিতে আমাদের অনেক কষ্টে গেছে। ফ্যাসিস্টদের নির্যাতনে আমাদের অনেক ভাই-বোন নির্যাতিত হয়েছে। এখানকার অনেক ভাই আমার সাথে কেরানীগঞ্জের কারাগারে ছিল। কাজেই আমরা সবাই মিলে যুদ্ধ করেছি। জুলাইয়ে আমাদের সন্তানেরা সবাই মিলে যে লড়াইটা করলো। আমরা একে বলি জুলাই যুদ্ধ। আমরা জুলাই যুদ্ধকে অনেক বড় করে দেখি।
কৃষকদের উদ্যেশে ফকরুল বলেন, মাঠে প্রচুর ধান কাটছে কৃষকেরা। আপনারা ধানের নায্য মূল্য চান। ধান ফলাতে যে সার ও বীজ লাগে, সেটা যেন সঠিকভাবে পান। তারেক রহমানের সরকার এই জিনিসগুলো ঠিক করতে চেষ্টা করছে। খাল খনন শুরু হয়েছে। এরফলে পানি ধরে রেখে কৃষি কাজে ব্যবহার করা হবে। এই জন্য কৃষক কার্ড শুরু করেছেন। মহিলাদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড করা হয়েছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য কিছু করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মোট কথা এই দুই মাসের মধ্যে তারেক রহমান দেশে একটা পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছেন। তিনি মিতব্যায়ী জীবন যাপন করেছেন। তাঁর নির্দেশেই দেশে রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকী পালন হচ্ছে।
আবারও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কবিতা, “যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে, সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া, তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর, এখনি অন্ধ বন্ধ কোরো না পাখা!” আবৃত্তি করে উপস্থিত দর্শকদের উদ্যেশে বলেন, যেতে হবে আমাদের, কূলে পৌঁছাতে হবে-এটাই হবে আমাদের লক্ষ্য।
পরিশেষে আত্রাইবাসীর উদ্যেশে নওগাঁ-৬ আসনের আত্রাই ও রাণীনগর এই দুই উপজেলাকে পৌরসভা এবং একটি ব্রীজ করার প্রস্তুতি দিয়ে তিনি বলেন, আমি যদি বেঁচে থাকি তাহলে আপনাদের ব্রীজও হবে, পৌরসভাও হবে।
অনুষ্ঠানটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন আত্রাই ও রাণীনগর উপজেলার দুই ইউএনও।
এ উপলক্ষে রবীন্দ্র কাচারি বাড়িতে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। এবং দেবেন্দ্র মঞ্চে জেলার বিভিন্ন এলাকার লোকজ সংস্কৃতি ও স্থানীয় রবীন্দ্র গবেষকরা অংশগ্রহণ করেন।
সরকারি ভাবে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলেও স্থানীয় ভাবে আরো কয়েকদিন এ উৎসব চলে। এসময় পতিসর কাচারি বাড়িতে কবিগুরুর ভক্তদের পদচারণায় এক মিলনমেলায় পরিনত হয়। কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে পতিসরে বসে এক গ্রামীণ মেলা। আর এ দিনকে ঘিরে স্থানীয়দের বাড়িতে বাড়িতে চলে উৎসবের আমেজ।
উল্লেখ, জেলার আত্রাই উপজেলার নাগর নদীর তীর ঘেষে গড়ে উঠা নিভৃত পল্লী পতিসর কাচারি বাড়ি। কবিগুরু জমিদারী প্রাপ্ত হয়ে প্রথম পতিসরে আসেন ১৮৯১ সালে ১৫ জানুয়ারিতে। এরপর থেকে কবি ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত নাগর নদ দিয়ে বজরায় চড়ে নিয়মিত এই কুঠি বাড়িতে আসতেন। সবশেষ আগমণ ঘটে ১৯৩৭ সালের ২৭ জুলাইয়ে। এখানে বসেই রচনা করেছেন অনেক কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ। এই প্রতিসরে বসেই আমাদের ছোট নদী চলে আঁকে বাঁকে, তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, দুই বিঘা জমি, বিখ্যাত উপন্যাস গোড়াসহ অসংখ বিখ্যাত সাহিত্য কর্ম রচনা করেছিলেন।