অষ্টগ্রাম হাবেলি বাড়িতে ১৯১ বছরের ঐতিহ্যের মহররম: আজ ‘নিশান গাস্ত’, কাল সমাপ্তি
যে আচার মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে শেখায় এবং কারবালার মজলুম শহীদদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে অনুপ্রাণিত করে, তা ইসলামের এক অনন্য নিদর্শনের প্রকাশ। এই আদর্শকে বুকে ধারণ করে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে সম্পূর্ণ নিজস্ব ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ নিয়মে পালিত হয়ে আসছে পবিত্র মহররমের শোকানুষ্ঠান।
ভাটির অলী হিসেবে পরিচিত এবং নয় কোষা জমিদারীত্যাগী সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (রহ.)-এর বংশধর সৈয়দ আবদুল করিম আল-হোসাইনী (রহ.) ওরফে সৈয়দ আলাই মিয়া সাহেব ১৮৩৫ সালে প্রথম এই নিয়মে মহররমের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। আজ দীর্ঘ ১৯১ বছর ধরে একই নিয়ম ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এই অঞ্চলে মহররম পালিত হয়ে আসছে।
ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় যারা রয়েছেন:
সৈয়দ আলাই মিয়া সাহেব ২২ মহররম পরলোক গমন করার পর এই ঐতিহ্যের হাল ধরেন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র মাওলানা সৈয়দ আবদুল হেকীম আল-হোসাইনী (রহ.)। এরপর বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মাওলানা সৈয়দ কুতুব উদ্দিন আহমেদ আল-হোসাইনী (রহ.) এই সিলসিলা বজায় রাখেন। বর্তমানে সৈয়দ আহমেদুল কবির প্রিন্স এলাকার হোসাইনী ভক্তদের নিয়ে এই মহররমের আয়োজন করছেন।
অষ্টগ্রামের হাবেলি বাড়ির এই নিয়ম অনুসরণ করে এখন কিশোরগঞ্জের বৌলাই সাহেব বাড়ি, হোসেনপুর, কটিয়াদি ও ভৈরব; নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল ও নাসিরনগর; হবিগঞ্জের ঐতিহাসিক সুলতানশী হাবেলী, বানিয়াচং, নবীগঞ্জ ও শায়েস্তাগঞ্জ এবং মৌলভীবাজার, সিলেট ও সুনামগঞ্জের অনেক এলাকায় সুন্নি অনুসারীরা মহররম পালন করছেন।
১০ দিনের কঠোর সংযম ও রীতিনীতি:
মহররমের চাঁদ দেখার পর থেকেই শুরু হয় ১০ দিনের কঠোর সংযম। এই দিনগুলোতে হোসাইনী ভক্তদের জীবনযাত্রায় এক গভীর শোকের আবহ তৈরি হয়: রোজা ও সাধারণ জীবনযাপন: চাঁদ দেখা যাওয়ার পর থেকে টানা ১০ দিন রোজা রাখা হয়। এই সময়ে আরাম-আয়েশের খাট বা পালং ছেড়ে সবাই মাটিতে ঘুমান। অত্যন্ত সাধারণ খাবার ও পোশাক পরিধানের পাশাপাশি খালি মাথায় ও খালি পায়ে হেঁটে কারবালার শোক প্রকাশ করা হয়। সকালের আয়োজন: প্রতিদিন ফজর নামাজের পর হোসাইনী মোকামে কারবালার ইতিহাস আলোচনা ও জারি গান পরিবেশন করা হয়। এরপর থেকে আসরের আগ পর্যন্ত চলে কারবালার নিশানি ‘তাজিয়া’ তৈরির কাজ। বিকেলের আয়োজন: আসর নামাজের পর মাতম ও মার্সিয়া (শোকগাথা) পরিবেশিত হয়। এরপর মাগরিবের আজানের পর ফাতিহা পাঠ, তাবাররক বিতরণ ও ইফতারের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে।
আজ ‘নিশান গাস্ত’, কাল শেষ দিন:
অষ্টগ্রাম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু বলেন, মহররমের ৯ ও ১০ তারিখে সব হোসাইনী ভক্তরা মিলে একসঙ্গে শোকমিছিল বের করেন, যা স্থানীয়ভাবে ‘গাস্ত’ বা ‘চক্কর’ নামে পরিচিত। এই আয়োজনের সার্বিক সহযোগিতা ও তত্ত্বাবধানে তিনি নিজেই কাজ করছেন।
এরই ধারাবাহিকতায় আজ বৃহস্পতিবার (২৫জুন) ৯ মহররম দুপুর ১২টা ১ মিনিটে অষ্টগ্রামের ঐতিহাসিক হাবেলি বাড়ি আল-হোসাইনী দরবার শরীফ থেকে ঐতিহ্যবাহী ‘নিশান গাস্ত’ (শোকমিছিল) বের হয়। আগামীকাল ১০ মহররম বিশাল তাজিয়া মিছিলের মাধ্যমে মধ্য অষ্টগ্রামের স্থানীয় কারবালা ময়দানে তাজিয়াগুলো সারিবদ্ধভাবে রেখে আসার মধ্য দিয়ে শেষ হবে ১০ দিনব্যাপী এই ঐতিহাসিক শোকানুষ্ঠানের