কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর সরকারি জমির গাছ বিক্রি করে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ ও কাল্পনিক শ্রেণি পরিবর্তন করে অতিরিক্ত কর আদায় এবং লাখ লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্যেসহ ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও অফিস সহায়ক বিরুদ্ধে।
সরকারি বিধিমালাকে তোয়াক্কা না করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে হয়রানি ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় বিক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা প্রতিকার চেয়ে ১৪ জুলাই মঙ্গলবার কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর ৪টি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সিলমোহর যুক্ত রিসিভ কপি থেকে এ তথ্য জানা যায়।
অভিযুক্তরা হলেন, উপজেলার ১নং গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার ও অফিস সহায়ক মো. রুকন উদ্দিন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভূমি অফিসের মাত্র ১০০ গজ সামনে গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর মৌজার ১নং খতিয়ানভুক্ত আর. এস. ১০৬৬৭ দাগের (শ্রেণি-হালট) ০.৮৩ একর সরকারি খাল ও রাস্তার পাশ থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে অফিস সহায়ক মো. রুকন উদ্দিন ও কতিপয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সহযোগিতায় বিভিন্ন প্রজাতির ২০ থেকে ২৫ টি সরকারি গাছ বিক্রি করে প্রায় ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন ওই ভূমি কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার। পরবর্তীতে এই ঘটনা ধামাচাপা দিতে এবং নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে এক অভিনব নাটকের আশ্রয় নেন তিনি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে গত ১৫ জানুয়ারি কুলিয়ারচর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ১৮টি গাছ চুরির একটি দায়সারা অভিযোগ দায়ের করেন তিনি। যে অভিযোগটি এখন পর্যন্ত থানায় এফআইআর কিংবা সাধারণ ডায়েরি হওয়াতো দূরের কথা অভিযোগটির কোথাও এন্ট্রি কিংবা তদন্ত পর্যন্ত হয়নি। থানা থেকে স্বাক্ষর ও সীলমোহরযুক্ত অভিযোগের একটি রিসিভ কপি এনে তা দেখিয়ে জনসাধারণের মুখ বন্ধ করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছেন তিনি। স্থানীয়দের প্রশ্ন, ভূমি অফিসের নাকের ডগায় দিনদুপুরে ২০ থেকে ২৫ টি গাছ কেটে নেওয়ার সময় তিনি কেন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি? এখানেই শেষ নয়, গত মাসেও তিনি আরও তিনটি সরকারি গাছ বিক্রি করে প্রায় ৮০ হাজার টাকা পকেটে পুরেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অপর দিকে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে তথ্য নিয়ম বহির্ভূতভাবে জমির শ্রেণি পরিবর্তন, কর হয়রানি, ঘুষ দাবি ও গ্রহণ নিয়ে একের পর এক চাঞ্চল্যকর চক্রান্ত ও হয়রানির চিত্র উঠে এসেছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
এদিকে লক্ষ্মীপুর গ্রামের ভুক্তভোগী মাহবুবুর রহমান জানান, গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর মৌজার বিআরএস ৩৫৮ খতিয়ানের সম্পূর্ণ পতিত জমির মালিক তিনি। ২০২৩ সালে তার বার্ষিক হাল দাবি ছিল মাত্র ১০ টাকা, যা তিনি পরিশোধ করেন। কিন্তু চলতি বছরের ৬ জুলাই কোনো প্রকার সরেজমিনে তদন্ত না করেই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে জমির ব্যাবহারিক শ্রেণি পরিবর্তন দেখিয়ে তার কাছ থেকে ৩০১২ টাকা খাজনা আদায় করেন নাছিমা আক্তার। এই অন্যায় ও অতিরিক্ত অর্থ ফেরত এবং বিচারের দাবিতে তিনি ১৪ জুলাই জেলা প্রশাসকের নিকট একটি আবেদন করেছেন।
অপর ভুক্তভোগী ভাটিজগৎচর গ্রামের মো. ছয়াইব হোসেন জানান, ‘ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী গ্রামীণ এলাকায় ব্যক্তি মালিকানাধীন কৃষি জমির পরিমাণ ২৫ বিঘা (৮২৫ শতাংশ) পর্যন্ত হলে খাজনা সম্পূর্ণ মওকুফ এবং মাত্র ১০ টাকা দাখিলা ফি প্রযোজ্য। তার পিতার সর্বমোট জমির পরিমাণ মাত্র ৪২০ শতাংশ (১২ বিঘা)। আইন অনুযায়ী খাজনা মওকুফ পাওয়ার কথা থাকলেও নাছিমা আক্তার সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার নিকট ১১ হাজার ৮৮৩ টাকা খাজনা দাবি করেন এবং তা না দিলে দাখিলা দিতে অস্বীকৃতি জানান। শুধু তাই নয়, ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে নামজারির প্রস্তাব পাঠানোর নাম করে তার কাছ থেকে ৫,০০০ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান। তিনিও এর প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসকের নিকট ১৪ জুলাই একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
ভুক্তভোগী পশ্চিম গোবরিয়া গ্রামের মো. কামাল হোসেন জানান, তার নিজ নামের নতুন খতিয়ান নং-১৩১১৩ এর খাজনা পরিশোধ করতে গেলে নাছিমা আক্তার তার কাছে ২৬ হাজার ৫২৬ টাকা দাবি করেন এবং ১৯৭৬-১৯৭৭ সন থেকে বকেয়া দেখান। অথচ নিয়ম অনুযায়ী পূর্বের খাজনা পরিশোধ ছাড়া নামজারি বা দলিল সম্ভব নয়। তিনি দাবি করেন, ২০২৩ সালে জমি দলিল করার সময় এবং ২০২৪ সালে নামজারি সম্পন্ন করার সময় পূর্বের সকল খাজনা সঠিকভাবে পরিশোধ করা হয়েছিল। খাজনা পরিশোধ ব্যতিরেকে কি দলিল ও নামজারি হওয়া সম্ভব এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ওই কর্মকর্তা সম্পূর্ণ অবৈধ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ১৯৭৬-১৯৭৭ সন থেকে বকেয়া দেখিয়ে এই বিশাল অঙ্কের অতিরিক্ত খাজনা দাবি করেন।
ওই কর্মকর্তার অন্যায় দাবির মুখে কোনো উপায় না পেয়ে তিনি নিরুপায় হয়ে স্থানীয় দলিল লেখক মো. নাছির উদ্দিনের মাধ্যমে নাছিমা আক্তারকে ৩,০০০ টাকা ঘুষ দেন কামাল হোসেন। কিন্তু ঘুষ নেওয়ার পরও তিনি জমির শ্রেণি অবৈধভাবে পরিবর্তন করে দেন এবং পূর্বের দাবিতে অনড় থাকেন, এমনকি ঘুষের টাকাও ফেরত দিতে অস্বীকার করেন। তাই তিনি এর প্রতিকার চেয়ে ও ওই কর্মকর্তার বিচার দাবিতে ১৪ জুলাই জেলা প্রশাসক বরাবর একটি আবেদন করেছেন।
একই গ্রামের মো. আরিফুল ইসলাম জানান, তার খতিয়ানের মূল রেকর্ড অনুযায়ী জমির শ্রেণি ‘বাড়ি’ ও ‘বাঁশঝাড়’ হলেও ওই কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার খতিয়ান সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে সেগুলোকে ‘আবাসিক’ এবং ‘চা বাগান’ হিসেবে দেখিয়ে কাল্পনিক শ্রেণি পরিবর্তন করেছেন। যেখানে কিশোরগঞ্জ জেলার কোথাও চা বাগান আছে এমন নজির নেই। এর মাধ্যমে তার ওপর ১২ হাজার ৪৩৫ টাকার বিশাল ও অযৌক্তিক খাজনা ধার্য করা হয়েছে। তিনি মূল শ্রেণী অনুযায়ী খাজনা দিতে চাইলে তা নাকচ করে মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করেন ওই কর্মকর্তা। নিরুপায় হয়ে তিনিও ১৪ জুলাই জেলা প্রশাসকের দ্বারস্থ হয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নাছিমা আক্তার ও রুকন উদ্দিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির জাল সুদূরপ্রসারী। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে একজনের জমি অন্যের নামে নামজারি করে দেওয়া এবং খোদ সরকারি সম্পত্তি প্রভাবশালীদের নামে নামজারি করে দেওয়ার মতো অসংখ্য গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এ দুজন টাকা ছাড়া কোন কাজই করেন না এমন দাবি সেবা গ্রহীতাদের। নিম্নে ১ হাজার ৫ শত টাকা ছাড়া নাম জারির কোন প্রস্তাব পাঠান না তিনি। আর যদি কাগজপত্রে সামান্য কোন ত্রুটি খুঁজে পান তাহলেতো আর কোন কথাই নেই, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসকে ম্যানেজ করার কথা বলে ২ থেকে ২০/২৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় সেবা গ্রহীতাদের নিকট থেকে। তাদের এই লাগামহীন অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারে সাধারণ মানুষ চরম অতিষ্ঠ।
ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ ও অর্থলোভী ভূমি কর্মকর্তা ও অফিস সহায়কের অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত এবং তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
অভিযুক্ত অফিস সহায়ক মো. রুকন উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তার বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসব বিষয়ে ম্যাডামের সাথে কথা বলুন।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছিমা আক্তারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ভূমি অফিসের সামনে সরকারি জায়গা থেকে কে বা কাহারা গাছগুলো কেটে নিয়েছে আমি জানি না। এ বিষয়ে আমি থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছি। থানায় অভিযোগ করায় একাধিক ব্যক্তি মোবাইল ফোনে আমাকে হুমকি ধামকি দিয়ে যাচ্ছে। কে বা কাহারা হুমকি দিচ্ছে এবং কোন নাম্বার থেকে হুমকি দিচ্ছে তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব তথ্য দিলে আমার সমস্যা আছে।
এতেই বুঝা যায় নিজের দোষ ঢাকতে অজানা ও কাল্পনিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাঁড় করিয়েছেন তিনি। অপর দিকে এ প্রতিনিধিকে বিভিন্ন প্রকার সুযোগ সুবিধা দেওয়া প্রস্তাবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ঘুষ দিয়ে ম্যানেজ করে সংবাদটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ওই কর্মকর্তা।
কুলিয়ারচর থানার সিল মোহরযুক্ত নাছিমা আক্তারের স্বাক্ষরিত অভিযোগের রিসিভ কপি উপস্থাপন করে কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দীনের নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি আপনার নিকট থেকে জেনে বুঝতে পারলাম আমি কুলিয়ারচর থানায় যোগদানের বহু আগেই গাছ কেটে নেওয়ার ঘটনাটি ঘটেছে। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। থানায় এ ধরনের কোন অভিযোগের কাগজপত্র কিংবা তথ্য নেই। তার পরও বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখছি।
এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বাবলী শবনমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়গুলো নিয়ে ইউএনও মহোদয়ের সাথে কথা বলে আপনাকে জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. ইয়াছিন খন্দকারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, যে-সব আবেদন জেলা প্রশাসক স্যারের নিকট করা হয়েছে স্যারই বিষয়গুলো দেখবেন। বাকী অভিযোগগুলো তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।