শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫১ অপরাহ্ন

তানোরে তেলের হাহাকার, বস্তার নৈরাজ্য আলু নিয়ে বেকায়দায় চাষীরা, বেড়েছে ভাড়া

সারোয়ার হোসেন, রাজশাহী প্রতিনিধি / ৩০ Time View
Update : রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৬

রাজশাহীর তানোরে পেট্রোল, ডিজেলের হাহাকার। আলু রাখা বস্তা নিয়ে চলছে বেপরোয়া সিন্ডিকেট।

এতে করে আলু উত্তোলন ও বহন নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। বস্তা সংকটের কারনে পানির দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে চাষীরা। ফলে বাধ্য হয়ে পানির দামে জমি থেকে বিক্রি করতে হচ্ছে আলু। আবার বস্তা না পেয়ে জমিতে বা বাড়ির আঙ্গিনায় স্তুপ করে রাখছে আলু।

সিন্ডিকেট চক্র ও মৌসুমি ফড়িয়া ব্যবসায়ী ও হিমাগার কর্তৃপক্ষ দাম নিয়ে প্রতি নিয়তই ইদুর বিড়াল খেলা খেলছেন। এদিকে তেল নিতে দিন রাত পেট্রোল পাম্পে ও দোকানে ধরনা দিচ্ছে গাড়ী চালকরা। কিন্তু চাহিদা মত তেল পাচ্ছে না। যার কারনে ফসল বহন করার পরিবর্তে বসে দিন পার করতে হচ্ছে শ্রমিকসহ চালকদের। কিন্তু এসব নিয়ে কৃষি বা বিপণন বিভাগের কোন গুরুত্ব নেই।

চাপাইনবয়াবগঞ্জ থেকে প্রতি বছরের ন্যায় এবারো দুটি ট্রলি নিয়ে আলু বহন ও উত্তোলন করতে আসেন খায়রুল সহ শ্রমিকরা। তারা এখানে এসে দুদিন বিভিন্ন পাম্প ও দোকানে দিন রাত ধরনা দিয়ে তেল পায়নি।

খাইরুল জানান, চাপাই থেকে আসার পথে যতগুলো পাম্প বা দোকান ছিল সব জায়গায় তেলের অপেক্ষা করেও পায়নি। যা তেল ছিল গাড়ীতে কোনমতে তানোরে এসে পৌঁছি। এখানে আসার পর রাতে ও দিনে চৌবাড়িয়া, মুন্ডুমালা ও কাশিম বাজার পাম্মে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকে তেল পায়নি। অবশেষে যার আলু বহন করতে এসেছি তার মাধ্যমে দোকান থেকে ৫০/৬০ লিটার ডিজেল পায় বাড়তি দামে। তেল পাওয়ার পর থেকে কাজ শুরু করতে পারি। তেল না পাওয়ার কারনে সময়মত আলু নিয়ে হিমাগারে যেতে পারছিনা। সময় নষ্ট হচ্ছে অনেক।

তানোর পৌর সদর এলাকার আলু চাষী ইউসুফ জানান, বস্তা না পাওয়ার কারনে ৬৮ বিঘা জমির আলু অর্ধেক তুলতে পারিনি। বস্তা পাওয়া যাচ্ছে না। বস্তা পেলে এতদিন পুরো জমির আলু তোলা শেষ হয়ে যেত। এখন ২০০ টাকার বেশি দাম চাচ্ছে বস্তার। আবার তেলের বাড়তি দামের কারনে ভাড়া দিগুণ হয়েছে। ৩০ টাকার ভাড়া ৬০ টাকা করে নেয়া হচ্ছে।

কাশিম বাজার এলাকার আলু চাষী জুয়েল জানান,  ঈদের আগে ১০ বিঘা জমির আলু তোলা হয়। কিন্তু বস্তা না পেয়ে হিমাগারে রাখা যায়নি। ১০ বিঘা জমির আলু স্তপ করা ছিল। ঈদের পরে বাধ্য হয়ে ১২ টাকা কেজিতে বিক্রি করা হয়েছে।

তিনি আরো জানান, ছোট ভাই আপেলের ১১ বিঘা জমির আলুও একসাথে তুলে বস্তা না পেয়ে স্তপ করে রাখার পর আমার সাথে বিক্রি করা হয়। তেলের বাড়তি দামের কারনে ভাড়া বেড়েছে দিগন্ত। বেড়েছে জমি চাষের খরচ। একবিঘা জমি চাষ করতে আগে লাগত ৪০০ টাকা এখন লাগছে ৬০০ টাকা করে।

চাষীরা জানান, তানোরে প্রশাসনে এসব নিয়ে কোন মাথা ব্যাথা ছিল না। তারা কৃষকের দূর্ভোগের কথা চিন্তায় করেননি। একটু অভিযান বা তদারকি করলে এত পরিমান সিন্ডিকেট হত। এখন বস্তা ব্যবসায়ীর তালিকা নিয়ে কি হবে। যেভাবে হোক চাষীরা বস্তা সংগ্রহ করবেই। কারন ফসল তো জমিতে রাখতে পারবে না। আবার বড় আলু চাষীদের বস্তার কোন সমস্যা নেই। তারা হিমাগারের সাথে সংশ্লিষ্টতা করে ঠিকই বস্তা পাচ্ছে। যত সমস্যা প্রান্তিক ছোট চাষীদের।

জানা গেছে, চলতি মৌসুমে আলু রাখা বস্তা নিয়ে বেপরোয়া সিন্ডিকেট শুরু হয়েছে। হিমাগার কর্তৃপক্ষ বস্তা মজুত করে রাখার কারনে বাজারে কৃত্রিম সংট তৈরি করা হয়েছে। এসংকটের কারণে দিগুণ দাম বেড়েছে বস্তার। আবার বাড়তি দামেও মিলছেবা বস্তা। যার কারনে প্রান্তিক চাষীরা পানির দামে লোকসানে বিক্রি করে দিচ্ছে আলু।

উপজেলার চোরখৈর গ্রামের আলুচাষি আতাউর রহমান এবার পৌনে চার বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। ফলন ভালো হয়েছে তাঁর। গত মঙ্গলবার এক ব্যবসায়ী ১৫ টাকা কেজি দাম বলে গেছেন। বুধবার তাঁর আলু নিতে আসার কথা ছিল। কিন্তু ওই ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, বস্তাসংকটের কারণে আলু নিতে আসতে পারছেন না। এখন বাড়ির পাশে আলুর স্তূপ ঠিকঠাক করছেন আতাউর, যাতে বৃষ্টি এলে আলু নষ্ট না হয়ে যায়।

রহমান কোল্ডস্টোরেজের মহাব্যবস্থাপক আবদুল হালিম বলেন, ‘এবার আলুর বস্তার মহাসংকট। গতবার যারা বস্তা বানিয়েছিল, সব বিক্রি হয় নাই। সেই আতঙ্কে এবার তারা বাড়তি বস্তা উৎপাদন করে নাই। যে কারণে এখন বস্তার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এবার আলু কেনার ক্রেতা বেশি। দাম কম তাই চাহিদা বেশি। কিন্তু ব্যাংকে টাকা থাকলেই আলু কেনা যায় না। আলু কেনার জন্য বস্তার প্রয়োজন। এখন একটা কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে কি না, যাঁরা কেনাবেচা করছেন, তাঁরা হয়তো বলতে পারবেন।

 

আলুচাষি ও ব্যবসায়ী রানা চৌধুরী  বলেন, গত বছর ৭৫ থেকে ৮৫ টাকার মধ্যে বস্তা পাওয়া গেছে। এ বছর মৌসুমের শুরু থেকেই ১২০ টাকা করে বস্তা কিনতে হয়েছে। ঈদের এক দিন পর ১৬০ টাকা করে বস্তা কিনেছেন। বস্তার অভাবে আলু কিনতে পারছেন না। এখন দাম উঠেছে ১৮০ টাকা। আলু রোপন ও উত্তোলনের সময় কোন না কোন সিন্ডিকেট চলেই। এবারে চলছে বস্তা সিন্ডিকেট। এসব বিষয়ে কৃষি বিপণন বিভাগের কোন নজরদারি নেই।  মুন্ডুমালা পৌর এলাকার বাসিন্দা আবদুল আউয়ালের এবার ৬০০ বস্তা আলু হয়েছে। তার মধ্যে ৩০০ বস্তা আলু ইতিমধ্যে তিনি হিমাগারে তুলে ফেলেছেন। বাকি ৩০০ বস্তা আলুর জন্য বস্তা খুঁজে পাচ্ছেন না। গত বছর যে বস্তার দাম সর্বোচ্চ ৮০ টাকা ছিল, এবার সেই বস্তা ১৮০ টাকা হয়েছে। গতকাল সেই বস্তার দাম চাইছে ১৯৫ টাকা। শেষ পর্যন্ত তিনি বস্তা না কিনে ফিরে এসেছেন। তিনি বলেন, স্টোর মালিকেরা নিশ্চিত একটা সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। যে কারণে আলুর দামও পড়ে গেছে। বুধবার যে আলু ১৬ টাকা ছিল, বৃহস্পতিবার সেই আলু ১৩ টাকাও নিতে চাচ্ছে না।মুন্ডুমালা পৌর এলাকার চুনিয়াপাড়া মহল্লার কৃষক শামসুজ্জামান ১০ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। তাঁর ৫০০ বস্তা চালু হয়েছে। তিনি বলেন, বুধবার ১৬ টাকা কেজি দরে আলুর দাম মিটিয়ে ব্যবসায়ী তাঁকে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম বায়না দিয়ে গিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার সেই ব্যবসায়ী আলুর দাম ১৩ টাকার বেশি নিতে পারবেন না জানিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত বলে গেছেন, অগ্রিম টাকাও ফেরত নেবেন না।কোল্ডস্টোরেজ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান বলেন, এবার পাটের দাম বেড়ে গেছে। গত বছর এক মণ পাট ৩ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এবার সেই পাট ৫ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। এ কারণে বস্তার দাম বাড়তে পারে। আর ছুটির কারণে কলকারখানা বন্ধ ছিল। তিনি আশা করছেন, সব কারখানা খুলে গেলে বস্তার সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।

উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানান, যারা  আগে বস্তা কিনেছিল তারা অল্প দামে পেয়েছে। এবারে পাটের দাম বেশি এজন্য  জুট মিলগুলো বস্তা কম তৈরি করেছে। যার কারনে বস্তার দাম বাড়তি। তবে দু এক দিনের মধ্যে জুট মিলগুলো বস্তা তৈরি শুরু করবে। বস্তা উৎপাদন শুরু হলে বাজার সঠিক নিয়মে চলে আসার কথা। হিমাগারে নাকি বস্তা মজুত আছে চাষীরা বলছেন জানতে চাইলে তিনি জানান, এটা আমাদের অজানা, কোন কৃষক সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইউএনও নাঈমা খাঁন জানান, আমি জেলা মিটিংয়ে আছি। বস্তা ব্যবসায়ীদের তালিকা সংগ্রহ করে তাদের কে ডাকা হবে এবং দাম বেশির ব্যাপারে জানতে চাওয়া হবে। তাদের সাথে এসব বিষয়ে কথা বলে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category