মৌলভীবাজার একসময় শান্ত জনপদ হিসেবে পরিচিত এই জেলায় এখন ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ছে মাদক। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই হামলা, মারধর এমনকি খুনের মতো ঘটনাও ঘটছে।
ফলে আতঙ্ক আর নীরবতার মধ্যেই দিন কাটছে সাধারণ মানুষের। জেলায় ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল, বিদেশি মদসহ বিভিন্ন মাদকের অবাধ বিস্তারে উদ্বিগ্ন স্থানীয় সচেতন মহল। অথচ স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের তৎপরতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই কম।
জানা যায়, জেলার শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, রাজনগর, বড়লেখা ও কমলগঞ্জ উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সব এলাকায় মাদক বিক্রিতে বাঁধা দেওয়ায় বা মাদক খাওয়া দেখে ফেলায় প্রকাশ্যে কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়রা বলছেন, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া, প্রভাবশালী মহল ও সীমান্তপথ ব্যবহার করে একটি চক্র মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
জেলা পুলিশ কার্যালয়ের সূত্রে জানা যায়, গত তিন মাসে জেলায় প্রায় ১ কোটি টাকার মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে। এ সময় বিভিন্ন অভিযানে প্রায় ৩০ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার অভিযোগ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
স্থানীয় ভুক্তভোগীরা বলছেন, মাদকের কারণে তরুণ সমাজ ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে।
পরিবারগুলোতে বাড়ছে অশান্তি, চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধও বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। “আগে এলাকায় এসব ছিল না। এখন ছোট ছোট ছেলেরাও মাদকে জড়িয়ে যাচ্ছে।” “রাত হলেই কিছু এলাকায় অচেনা মানুষের আনাগোনা বাড়ে। আমরা খুব আতঙ্কে থাকি।” “এখন ঘর থেকে বের হলেই ভয় লাগে। এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনা হচ্ছে, কিন্তু কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না।”“যারা প্রতিবাদ করে তাদের হুমকি দেওয়া হয়। অনেক সময় মারধরের ঘটনাও ঘটে।
মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় প্রাণ হারানোর অভিযোগও রয়েছে। ভুক্তভোগী এক মা এর অভিযোগ করে বলেন, মাদকাসক্তদের হাতে তার সন্তান খুন হলেও এখনও পাননি কাঙ্ক্ষিত বিচার। “আমার ছেলেকে মাদকের কারণে মেরে ফেলেছে। আমি আমার সন্তানের হত্যার বিচার চাই।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বলছেন, প্রশাসনের কঠোর উদ্যোগ ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
শ্রীমঙ্গলেও ব্যবসায়ীরা মাদকবিরোধী মানববন্ধন ও সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, প্রতিবাদ করতে গেলে ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের উপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করা হয়।
জেলার সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, শুধু ছোটখাটো কারবারিদের ধরা হলেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে হামলা, হুমকি ও সামাজিকভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। ফলে ভয়ে অনেকে মুখ খুলতেও সাহস পাচ্ছেন না।
সীমান্তবর্তী উপজেলা হওয়ায় ভারত থেকে বিভিন্ন পথে মাদক প্রবেশ করছে। বিশেষ করে কুলাউড়া, বড়লেখা ও কমলগঞ্জ সীমান্ত এলাকা এখন মাদক পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন- অভিযান আর বক্তব্যের পরও কেন থামছে না মাদকের বিস্তার? কেন এখনও আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে প্রতিবাদকারীদের? সচেতন মহল বলছে, সমন্বিত উদ্যোগ আর কঠোর নজরদারি ছাড়া এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
মৌলভীবাজার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) নোবেল চাকমা, মুঠোফোনে বলেন, মাদক নির্মূলে আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছি। জেলা থেকে মাদক নির্মূল করতে পুলিশের প্রত্যেকটি টিম সক্রিয় রয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিতভাবে অভিযান পরিচালনা করছে। তিনি আরোও বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা হচ্ছে, আপনারা খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন। জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। অভিযান চালিয়ে যাদের আটক করা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গ্রেপ্তার হওয়া বর্তমানে কারাগারে রয়েছে।”