স্বপ্ন ছিল প্রবাসে গিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন। কষ্ট করে উপার্জন করবেন, একদিন ফিরবেন আপনজনের কাছে। কিন্তু সেই ফেরাটা আর জীবন্ত হয়ে হলো না। সৌদি আরবের রিয়াদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে প্রাণ হারানো ১৬ বাংলাদেশির মধ্যে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার সাতজনের মরদেহ ফিরছে দেশে। প্রিয়জনের পোড়াদেহ একনজর দেখার অপেক্ষায় এখন শোকে পাথর হয়ে আছেন স্বজনরা।
আগামী বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) পরিচয় শনাক্ত হওয়া ৯ বাংলাদেশির মরদেহের সঙ্গে আত্রাইয়ের সাতজনের মরদেহও দেশে আসবে। স্বজনদের কাছে এ যেন একসঙ্গে স্বস্তি ও অসহনীয় বেদনার দিন। আপনজনকে ফিরে পাবেন, কিন্তু জীবিত নয়, নিথর দেহ হয়ে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বাংলাদেশ দূতাবাস, রিয়াদ, সৌদি আরবের কাউন্সেলর মুহাম্মদ রেজায়ে রাব্বি স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি কর্মী নিহত হন। সৌদি কর্তৃপক্ষ ফিঙ্গারপ্রিন্ট পরীক্ষার মাধ্যমে ৯ জনের পরিচয় শনাক্ত করেছে। মরদেহগুলো দেশে পাঠানোর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৪০ নম্বর ফ্লাইটে বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা ৫ মিনিটে মরদেহগুলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
সৌদি দূতাবাসের তালিকা অনুযায়ী, শনাক্ত হওয়া নওগাঁর সাতজন হলেন আত্রাই উপজেলার উদনপৈ গ্রামের ময়েন উদ্দীনের ছেলে মো. ফরিদ, গণ্ডগোহালী গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল প্রামাণিক, একই গ্রামের গুফফার প্রামাণিকের ছেলে মোহন আলী ও সুমন আলী এবং বজলুর রহমানের ছেলে কলিমুদ্দিন, ডুবাই গ্রামের বাদল তরফদারের ছেলে সোহেল রানা এবং মার্কাসুন্দা গ্রামের তমেজ উদ্দিন সরদারের ছেলে আব্দুল জলিল সরদার।
নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রিয়জনকে হারানোর শোকের সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে শেষবারের মতো তাকে দেখার আকুতি। যে মানুষটি একদিন হাসিমুখে পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বিদেশের মাটিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন, সেই মানুষটিই এখন ফিরছেন কফিনবন্দি হয়ে। কারও ঘরে সন্তান অপেক্ষা করছে বাবার জন্য, কারও স্ত্রী অপেক্ষা করছেন স্বামীর ফেরার জন্য, আবার কোনো মা হয়তো বারবার পথের দিকে তাকিয়ে আছেন ছেলের অপেক্ষায়।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমন্বয় করে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে মরদেহগুলো বিমানবন্দর থেকে পরিবারের কাছে বিনা খরচে পৌঁছে দেওয়া যায়।
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত পরিচয় শনাক্ত হওয়া আত্রাই উপজেলার সাতজনের মরদেহ দেশে আসছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের পর প্রথম দিকে আত্রাই উপজেলার ১৩ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও বর্তমানে উপজেলার ১১ জন এবং নওগাঁ সদর উপজেলার একজনের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে। অন্য মরদেহগুলো দেশে আনার প্রক্রিয়াও চলছে।
এদিকে সাতজনের মরদেহ দেশে ফেরার খবরে আত্রাইয়ের বিভিন্ন গ্রামে নেমে এসেছে শোকের আবহ। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠছে বাতাস। কেউ আর প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন না, অপেক্ষা করছেন শুধু শেষবারের মতো তাকে দেখার।
জীবনের প্রয়োজনে যারা হাজার মাইল দূরে পাড়ি জমিয়েছিলেন, আগুনের লেলিহান শিখা তাদের সেই জীবনযাত্রার ইতি টেনেছে। বৃহস্পতিবার তারা ফিরবেন ঠিকই, তবে ফিরবেন নিথর হয়ে। পরিবারের কাছে এ ফেরার আনন্দ নেই, আছে বুকভরা কান্না আর একটিবার প্রিয় মুখটি দেখার শেষ আকুতি।