বাগেরহাট শহরের ঐতিহ্যবাহী গাজী কালু সাহেবের দরগাহ সংলগ্ন সরকারি খাস জমি জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড করে দখলের অভিযোগ তুলে নিরপেক্ষ তদন্ত, বিতর্কিত রেকর্ড বাতিল এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন দরগাহের খাদেম, ভক্ত ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
শনিবার (১৮ জুলাই) সকাল ১১টায় বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সামনে “ভূমিদস্যুদের কবল থেকে সরকারি খাস খতিয়ানের জমি উদ্ধার ও ঐতিহ্যবাহী গাজী কালুর দরগা সংরক্ষণ” শীর্ষক ব্যানারে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে দরগাহের খাদেম, ভক্ত ও স্থানীয় বাসিন্দাসহ প্রায় ৫০ জন অংশ নেন।
এর আগে দরগাহের বর্তমান খাদেম জামাল হাওলাদার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর বাবা মরহুম ইউসুফ হাওলাদার দীর্ঘদিন দরগাহের খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাবার মৃত্যুর পর থেকে তিনিই দরগাহটির দেখাশোনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
অভিযোগে বলা হয়, বাগেরহাট সদর উপজেলার ১৫৬ নম্বর সরুই মৌজার সিএস ৭৯৭ ও এসএ ৭০১ নম্বর খতিয়ানভুক্ত সম্পত্তির মূল মালিক দেশত্যাগ করার পর জমিটি সরকারি খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১০০৮ নম্বর দাগে দরগাহ এবং ১০১০, ১০১২, ১০১৪, ১০২১, ১০৩১ ও ১০৩৪ নম্বর দাগের জমি দীর্ঘদিন ধরে দরগাহ, মসজিদ, খাদেমের বসতঘর, খানকাহ ও যাতায়াতের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এছাড়া ১০৪০ নম্বর দাগে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসক ও খাদেমের দখল-দায়িত্ব রেকর্ডভুক্ত রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, একটি প্রভাবশালী চক্র সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে সরকারি খাস জমি অবৈধভাবে ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড করিয়ে বর্তমানে জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে সেটেলমেন্ট অফিসে রিভিউ আবেদন করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ করা হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, গাজী কালুর দরগা শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি বাগেরহাটের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড হওয়ার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন, বিতর্কিত রেকর্ড বাতিল এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন মো. কামরুল শেখ, মহারাজ শেখ ও দরগাহের খাদেম জামাল হাওলাদার।
মো. কামরুল শেখ বলেন, “গাজী কালুর দরগা ও এর জমি সরকারি সম্পদ। যদি জমিটি সরকারের নামে রেকর্ডভুক্ত থাকে, তাহলে কীভাবে তা ব্যক্তি মালিকানায় গেল—এটাই আমাদের প্রশ্ন। সরকার জমিটি সংরক্ষণ করুক এবং এখানে একটি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নিক। এক সময় এখানে গাজীর গীতসহ নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ আসতেন। কিন্তু বর্তমানে দখল ও অবৈধ স্থাপনার কারণে সেই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে।”
মহারাজ শেখ বলেন, “সরকারি খাস জমি কীভাবে ব্যক্তির নামে রেকর্ড হলো, তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। এখানে একটি পাঁচ ওয়াক্তের মসজিদ রয়েছে। আমরা চাই সেটিকে জামে মসজিদে উন্নীত করা হোক। পাশাপাশি যাদের বিরুদ্ধে সরকারি জমি নিজেদের নামে রেকর্ড করার অভিযোগ উঠেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
গাজী কালুর দরগাহের খাদেম জামাল হাওলাদার বলেন,
“গাজী কালুর দরগার জমি সরকারি খতিয়ানে রেকর্ডভুক্ত। কিন্তু বিগত সরকারের সময় প্রভাব খাটিয়ে কয়েকজন ব্যক্তি এই জমি নিজেদের নামে রেকর্ড করে নিয়েছেন বলে আমরা অভিযোগ করছি। আমরা চাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন হোক, সরকারি জমি সরকারের দখলেই থাকুক এবং দরগার ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা হোক। একই সঙ্গে এখানে একটি মসজিদ নির্মাণে সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি।
এ বিষয়ে আমরা দুর্নীতি দমন কমিশন, খুলনা বিভাগীয় কমিশনার, বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করেছি। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও আমরা কোনো প্রতিকার পাইনি। তাই নিরুপায় হয়ে আজ বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করতে বাধ্য হয়েছি।
আমাদের জানা মতে, সরকার এই জমি এখনো পর্যন্ত কাউকে বন্দোবস্ত বা মালিকানা দেয়নি। তাহলে কীভাবে এটি ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড হলো—সেটিই আমাদের বড় প্রশ্ন। বিগত সরকারের সময় এ বিষয়ে কথা বলতে গেলেই আমাদের মামলা-হামলার ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হতো। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত চাই এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।
তিনি অভিযোগ করেন, ডা. সিরাজুল হক, শ্যামল কুমার নাগ, বিজয় কৃষ্ণ হালদার, শেখ আছাদুল ইসলাম ও শেখ হাসানুল ইসলাম প্রভাব খাটিয়ে সরকারি খাস জমি নিজেদের দখলে নিয়েছেন।
এ বিষয়ে অভিযোগ অস্বীকার করে ডা. সিরাজুল হক বলেন, প্রায় ২০ বছর আগে আমরা নারায়ণ নাগের কাছ থেকে জমিটি ক্রয় করেছি। জমির বৈধ দলিলসহ সব মূল কাগজপত্র আমাদের কাছে রয়েছে। দরগার খাদেমরা বিভিন্ন দপ্তরে আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও মামলা করেছেন, কিন্তু কোথাও তারা সফল হননি। ভূমি অফিসেও অভিযোগ দিয়েছেন, সেখানেও তাদের দাবি গ্রহণ করা হয়নি। আগামী ২২ জুলাই এ বিষয়ে একটি মামলার তারিখ রয়েছে। যদি আমাদের বৈধ কাগজপত্র না থাকত, তাহলে সরকার কীভাবে আমাদের দখলে থাকতে দিত? আমরা কোনো প্রভাব খাটিয়ে জমি দখল করিনি।
অপর অভিযুক্ত শেখ শামসুল উদ্দিন বলেন,এটি ব্রিটিশ আমলের সম্পত্তি। আমাদের কাছে বৈধ দলিল রয়েছে এবং আমরা দীর্ঘদিন ধরে আইনগতভাবেই জমিটি ভোগদখল করে আসছি। তাই অবৈধ দখলের অভিযোগ সঠিক নয়।