চোখেমুখে অসহায়ত্বের ছাপ, বুকে স্বজন হারানোর বেদনা। পোশাক ও শরীরে আর্থিক সংকটের স্পষ্ট প্রমান। বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে ঘূর্নিঝড়ে নিখোজ জেলে পরিবারের সাথে মতবিনিময় সভায় উপস্থিত এসব নারী-পুরুষদের রয়েছে আলাদা আলাদা পরিচয়।
তবে এখানে এসেছেন সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোজ ও নিহত হওয়া জেলের পরিবারের সদস্য হিসেবে। কচুয়া উপজেলার বগা, বিষখালি, বাধাল, বড় আন্ধরমানিক, চাড়াখালি ও মাদারতলা গ্রামের বাসিন্দা তারা। ২০১৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর শেষ রাতের একটি আকস্মিক ঘূর্নিঝড়ে বঙ্গপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে তাদের স্বজনরা নিখোজ এবং নিহত হয়েছেন।
কারও স্বামী, কারও বাবা, কারও ভাই, কারও সন্তান রয়েছে মাছ ধরতে গিয়ে আর না ফেরার তালিকায়। ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসেই এক সাথে ১৯ জন জেলে সহ ৩৫ জেলে নিখোজ হয়। কেউই পাননি তার স্বজনদের মরদেহ। আর বঙ্গোপসাগরে এবং সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে ঝড়-জলচ্ছাস, বাঘ-কুমিরের আক্রমন বা কোন দূর্ঘটনায় নিহত হলে মৎস্য অধিদপ্তর ও বন বিভাগ থেকে সহযোগিতা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও, নির্ধারিত সময়ে মৃত্যু সনদ দিতে না পারায় এসব পরিবারগুলো এখনও সেই সহায়তা পায়নি। পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অসহায় অবস্থায় রয়েছে এই পরিবারগুলো খেয়ে পড়ে বাঁচার জন্য সরকারি সহযোগিতা কামনা করেছেন এসব পরিবারের সদস্যরা।
মতবিনিময় সভায় আসা বগা গ্রামের ফিরোজা বেগম বলেন, “আমার ছেলে মোঃ কামাল হোসেন ২০১৫ সালে সাগরে গিয়ে নিখোজ হয়। জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিয়ে সাগরে খুজতেও গিয়েছি আমরা, মরদেহ পর্যন্ত পাইনি। ভয়ে আর ছোট ছেলেকে সাগরে পাঠাইনি। অনেক কষ্ট করে জীবন কেটেছে, মৃত্য সনদ দিতে না পারায় কোন সরকারি সহযোগিতা আমরা পাইনি। ছোট ছেলেটা লেখাপড়া শিখেছে, নিহত জেলে পরিবার হিসেবে ওরে যদি একটা চাকুরী দিত, তাহলে হয়তা আমরা খেয়ে পড়ে বাঁচতে পারতাম।
তাসলিমা বেগম নামের আরেক নারী বলেন, তার স্বামী জলিল ফকির সাগরে গিয়ে মারা গেছে। তার পরিবারের পাশে দাড়ানোর মত কেউ নেই। সন্তানদের নিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে জীবন বাঁচিয়ে রেখেছেন তিনি। সরকারের পক্ষ থেকে কোন ব্যবস্থা করলে তারা বাঁচতে পারতেন।
শিরিন আক্তার নামের এক নারী বলেন, ছোট ছোট তিনটা সন্তান রেখে আমার স্বামী সাগরে গিয়ে মারা যায়। তার মরদেহও পায়নি। মানুষের বাড়ি, রাস্তা ও এমনকি মাঠে কাজ করে সন্তানদের বড় করেছেন তিনি। সরকারি সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও উল্লেখযোগ্য তেমন সহযোগিতা পায়নি তারা। এমনকি মরদেহ খুজে না পাওয়ায় তখন ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মৃত্যু সনদও দেওয়া হয়নি।
বগা এলাকার মাছ ব্যবসায়ী ইব্রাহীম আমানী বলেন, তিনিও একসময় সাগরে মাছ ধরতে যেতেন। সাগরের ভয়াবহতার কারণে এখন আর মাছ ধরতে যান না। তবে যারা নিখোজ হয়েছে, সেসব পরিবার খুবই মানবেতর জীবন যাপন করছে। এদেরকে যদি সরকারি সহায়তার আওতায় আনা যায় তাহলে পরিবারগুলো ভাল ভাবে জীবন পার করতে পারবে।
বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতি, কচুয়া উপজেলা শাখা উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এই মতবিনিময়ের আয়োজন করে। জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতি, বাগেরহাট জেলা শাখার আহবায়ক মোঃ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আলী হাসান।
বিশেষ অতিথি ছিলেন, কচুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরদার জাহিদ, সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম।
অসহায় পরিবারগুলোর বিষয়ে সরদার জাহিদ বলেন, তাদের যে অসাহয়ত্ব সেটা ভাষায় প্রকাশ করা খুবই কঠিন। তবে এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় বিভিন্ন সময় তাদের কিছু সহযোগিতা করা হয়েছে। তাদের জন্য স্থায়ীভাবে কিছু করার চেষ্টা করা হচ্ছে। পরিকল্পিত প্রকল্পের মাধ্যমে অসহায় পরিবারগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করার আশ্বাস দেন কচুয়া উপজেলা বিএনপির এই নেতা।
কচুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আলী হাসান বলেন, নিখোজ পরিবারগুলোকে যেসব সহযোগিতা করা হয় সেসব খুবই অপ্রতুল। তাদের সুযোগ-বুবিধা বৃদ্ধি করার জন্য সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান উপজেলা প্রশাসনের এই শীর্ষ কর্মকর্তা।